শিশু ধর্ষণ মামলায় খালাস পাচ্ছে ৭০ ভাগ অপরাধী

দেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামি খালাস পাওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি বলে আইন ও বিচার গবেষণা সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তথ্যসূত্রে উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থার গবেষণার ভিত্তিতে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, শিশু ধর্ষণ ও এ ধরনের জঘন্য অপরাধের মামলায় প্রায় ৭০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে, আর শাস্তি হচ্ছে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষ্য ও প্রমাণ ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গত এক দশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ২ হাজার ৮৬২ জন শিশু, অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৬০ শতাংশ, ১৮ বছর বা তার কম বয়সী ছিল। এদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ছিল।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে ৩০৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স ছিল ৬ বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে এবং ১০৩ জন কিশোরী। একই সময়ে ২৫১টি ঘটনায় মামলা হলেও ৫৫ জন ভুক্তভোগী শিশু বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যায় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

আইন মন্ত্রণালয় ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শক্ত আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে না। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে গড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় লাগছে। তদন্ত পর্যায়ে ডিএনএ পরীক্ষা দেরিতে হওয়া, সাক্ষ্য সংগ্রহে জটিলতা, তদন্ত কর্মকর্তার ঘন ঘন বদলি, মামলা জট, এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘসূত্রিতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতাধীন মামলার মধ্যে ৮৭ শতাংশে চার্জশিট দেওয়া হয়, আর ১৩ শতাংশে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের একটি বড় অংশই প্রমাণের অভাব বা মামলার অসংগতির কারণে হয়। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল পরীক্ষা দেরিতে হওয়া, আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং সাক্ষীর অনাগ্রহ বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

দেশে বর্তমানে ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। তবে এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। তুলনামূলকভাবে বিচারক ও সহায়ক জনবলের ঘাটতির কারণে মামলার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, একটি মামলার বিচার চলাকালে গড়ে ২২ বার তারিখ পরিবর্তন হয়, যা আসামিপক্ষের জন্য সময়ক্ষেপণের সুযোগ তৈরি করে।

আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। পাশাপাশি ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার সীমিত সুবিধা, মাত্র কয়েকটি ল্যাব থাকা এবং জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব তদন্তকে দুর্বল করছে। তারা প্রতি জেলায় ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন।

বিভিন্ন উদাহরণে দেখা যায়, বহু আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দীর্ঘ সময়েও চূড়ান্ত রায় কার্যকর হয়নি বা বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে। অন্যদিকে কিছু মামলায় দীর্ঘ বিচার শেষে রায় হলেও তা উচ্চ আদালতে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স পর্যায়ে ঝুলে থাকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যদিও একই ধরনের অপরাধে দেড় শতাধিক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কারাগারে রয়েছে।

গবেষক ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ার এই দুর্বলতা শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতার মতো অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করতে পারে, যদি না তদন্ত, বিচার এবং সাক্ষী সুরক্ষায় কার্যকর সংস্কার আনা হয়।