খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ২:২৩ পিএম

ভেনেজুয়েলায় মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা তৈরি করেছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই সামনে আনছে। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং উদ্ধার, চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে ভেনেজুয়েলার ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে অঞ্চলে। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। প্রথম কম্পনের মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত একাধিক শক্তিশালী কম্পন ভবন, সেতু, সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ধরনের ভূমিকম্প বড় ধরনের মানবিক সংকটের জন্ম দিতে সক্ষম। সংস্থাটির ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেল অনুযায়ী, দ্বিতীয় ভূমিকম্পের পর ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও এসব তথ্য সম্ভাব্য ঝুঁকির পূর্বাভাস মাত্র, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণে আরও সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবল কম্পন অনুভূত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, বহু আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কয়েকটি স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছু অঞ্চলে জ্বালানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে, ফলে উদ্ধারকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অনেক স্থানের পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি এখনও জানা সম্ভব হয়নি। জরুরি চিকিৎসা দলগুলোকে হাসপাতাল ও অস্থায়ী চিকিৎসা শিবিরে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
পরিস্থিতির অবনতির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে দূরে থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা জানান। তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে। উদ্ধার তৎপরতা তদারকি ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন জ্যেষ্ঠ জেনারেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভাষণে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার আহ্বান জানান।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মাদক পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে মার্কিন কর্তৃপক্ষ আটক করার পর থেকে ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভূমিকম্প তাঁর প্রশাসনের সামনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মানবিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষার সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে জীবিতদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা জানতে আরও সময় লাগবে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মন্তব্য