বাংলাদেশের “বিপ্লবী ব্যাংকার” খ্যাত লুৎফর রহমান সরকারের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে। তিনি ছিলেন দেশের ব্যাংকিং খাতকে জনমুখী ও উন্নয়নমুখী করার অন্যতম অগ্রদূত।
১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের ফুলকোট গ্রামে জন্ম নেওয়া লুৎফর রহমান সরকার জীবনের শুরু থেকেই মেধা, নীতি ও মানবিক মূল্যবোধে অনন্য ছিলেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কর্মজীবন শুরু করেন রেডিও পাকিস্তানে। পরে হাবিব ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ষষ্ঠ গভর্নর হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ও পরে ব্যাংকিং খাতে তাঁর নেতৃত্ব ও চিন্তাধারা দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
তিনি বিশ্বাস করতেন ব্যাংকিং কেবল মুনাফার জন্য নয়; বরং এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার। তাঁর মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে স্বাবলম্বী করা।
এই দর্শন থেকেই তিনি চালু করেন “বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)”, যেখানে উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি শিক্ষা ঋণ ও খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ তৈরি করে তিনি তরুণ সমাজে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন।
তিনি ছিলেন দেশের প্রথমদিকের ব্যাংকারদের একজন, যিনি জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম চালু করেন, যা পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। চিকিৎসা, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক খাতেও তিনি সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। সামরিক শাসনামলে একটি প্রকল্প নিজের নামে চালানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। তবুও তিনি ন্যায় ও স্বচ্ছতার পথ থেকে সরে আসেননি।
২০১৩ সালের ২৪ জুন ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
লুৎফর রহমান সরকার শুধু একজন ব্যাংকার নন, ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও সমাজ সংস্কারক—যিনি আর্থিক ন্যায়বিচারের এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
মন্তব্য