রাশিয়া সম্প্রতি তাদের অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) ‘আরএস-২৮ সারমাত’-এর সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি ৩৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। উচ্চ গতির পাশাপাশি এটি একাধিক পরমাণু অস্ত্র বা ওয়ারহেড বহন করার ক্ষমতা রাখে।
ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতা
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সারমাত বিশ্বের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী এবং এটি পশ্চিমা সামরিক জোটের কাছে থাকা যেকোনো প্রযুক্তির চেয়ে উন্নত। এই ক্ষেপণাস্ত্রের গতি এবং পাল্লা একে প্রায় অপরাজেয় করে তুলেছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়মিত সামরিক বহরে বা ‘যুদ্ধকালীন দায়িত্বে’ মোতায়েন করা হবে।
নিচে ‘সারমাত’ ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের নাম | বিস্তারিত তথ্য |
| ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন | আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) |
| সর্বোচ্চ পাল্লা | প্রায় ৩৫,০০০ কিলোমিটার |
| অস্ত্রের ধরন | পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় প্রকার ওয়ারহেড |
| বিশেষ সক্ষমতা | একাধিক স্বাধীন লক্ষ্যযোগ্য রি-এন্ট্রি ভেহিকল (MIRV) বহনযোগ্য |
| মোতায়েনের সময় | ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ (প্রত্যাশিত) |
‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি ও বর্তমান ভূ-রাজনীতি
রাশিয়ার এই সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ (New START)-এর মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের হাতে থাকা কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে মস্কো বা ওয়াশিংটনের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা অবশিষ্ট নেই। যদিও উভয় পক্ষ উচ্চ পর্যায়ের সামরিক সংলাপ চালিয়ে যেতে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো কার্যকর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক অবস্থান ও চীনের ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটন বারবার জোর দিয়ে আসছে যে, নতুন যেকোনো পারমাণবিক চুক্তিতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের মতে, আধুনিক বিশ্বে কেবল রাশিয়া নয়, চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে বেইজিং শুরু থেকেই এ ধরনের কোনো ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। চীনের দাবি, তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট, তাই এখনই এই চুক্তিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা অযৌক্তিক।
সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রের এই সফল পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর অনিশ্চয়তা বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি নতুন করে বাড়িয়ে তুলেছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সারমাত কেবল একটি অস্ত্র নয়, বরং এটি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
