খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২৬, ৬:২০ পিএম

নোবেলজয়ী কবি, সাহিত্যিক ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বাংলাদেশে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও সংস্কৃতির এই অনন্য স্রষ্টাকে স্মরণ করছেন দেশের অগণিত মানুষ। তাঁর অমর সৃষ্টি, মানবতাবাদী দর্শন এবং সৌন্দর্যবোধ আজও বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহাসিক ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, তাঁর প্রয়াণ দিবস প্রতিবছর ২২ শ্রাবণ হিসেবে বাংলাদেশে পালিত হয়। চলতি বছর বাংলা ২২ শ্রাবণ পড়েছে ৬ আগস্ট। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
স্মরণসভা, আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই মহান পুরুষকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা ২৫ বৈশাখ ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে। তিনি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর ১৩ জন জীবিত সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ, দেশীয় ঐতিহ্যের চর্চা এবং বিশ্বের নানা সাহিত্যধারার সঙ্গে পরিচয় তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে বিকশিত করে।
দীর্ঘ প্রায় সাত দশকের সৃজনশীল জীবনে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও চিত্রকর্ম। তাঁর লেখায় মানুষের অন্তর্গত অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য, স্বাধীন চিন্তার আকাঙ্ক্ষা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটেছে।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকীর্তির বিস্তৃতি ছিল অসাধারণ। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস ও গল্প বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। গীতাঞ্জলি, গোরা, ঘরে-বাইরে, শেষের কবিতা, চোখের বালি এবং ডাকঘর তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম।
সংগীত জগতেও রবীন্দ্রনাথের অবদান অতুলনীয়। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব গান নিয়ে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র সংগীতধারা ‘রবীন্দ্রসংগীত’, যা বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রেম, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক অনুভূতির নানা দিক তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আরও উজ্জ্বল হয় ১৯১৩ সালে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মাধ্যমে তিনি এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তাঁর সাহিত্য বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়ের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। তাঁর লেখা “আমার সোনার বাংলা” বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং “জন গণ মন” ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হিসেবে তাঁর অবস্থান বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজদর্শী। শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তার বাস্তব রূপ দেখা যায় শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে মুক্ত চিন্তার বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
তাঁর প্রয়াণের ৮৫ বছর পরও রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও সৃষ্টি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। মানুষের স্বাধীনতা, ভালোবাসা, সাম্য, সৌন্দর্য এবং শান্তির যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন, তা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের দলিল নয়; বরং তা মানুষের চিরন্তন অনুভূতি, স্বপ্ন ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। তাই তাঁর প্রয়াণবার্ষিকী শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং তাঁর আদর্শ ও সৃষ্টির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
৮৫ বছর পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির মনন, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের গভীরে জীবন্ত হয়ে আছেন। তাঁর সৃষ্টি যতদিন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে থাকবে, ততদিন তিনি বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
মন্তব্য