আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভিসা পাওয়ার তীব্র জটিলতা উপেক্ষা করেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ফুটবল যাত্রা শুরু করেছে ইরান। প্রাথমিক নিয়মানুযায়ী দলটির জন্য সকালে পৌঁছে খেলা শেষে সেই সন্ধ্যায়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার কঠোর নির্দেশনা ছিল। পরবর্তীতে এই নিয়মে কিছুটা শিথিলতা এনে ম্যাচের একদিন আগে মেক্সিকো থেকে সেখানে গিয়ে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। এমন এক বৈরী ও মানসিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি। খেলার মাঠে দুই-দুই বার পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিউজিল্যান্ডের সাথে ২-২ গোলের সমতায় ম্যাচ শেষ করেছে ইরান।
সাধারণত বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিটি দেশের খেলোয়াড়দের মাঝে যে আনন্দ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে, ইরান দলের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। দলটির অধিনায়ক মেহদি তারেমি গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন যে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক ফুটবলীয় অনুভূতিগুলোই কাজ করছে না। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটির বিশ্বকাপ প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক ক্রীড়াসূচি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরানের ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি উঠলেও আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা তা নাকচ করে দেয়। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই তাদের ম্যাচগুলো খেলার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। সব প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে ইরান বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত অটুট রাখে। তবে টুর্নামেন্ট চলাকালে তারা নিজেদের অনুশীলনের মূল ঘাঁটি অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় স্থানান্তর করে। প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন তারা ভেন্যুতে পৌঁছাচ্ছে এবং খেলা শেষেই দ্রুত আবার মেক্সিকোতে প্রত্যাবর্তন করছে।
ম্যাচের গোল ও প্রধান কুশীলবদের বিবরণ
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই রোমাঞ্চকর ম্যাচের গোলের বিবরণ নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| গোলের সময় | গোলকারী দল | গোলদাতার নাম | সহায়তাকারী খেলোয়াড় | ম্যাচের স্কোরলাইন |
| ০৭ মিনিট | নিউজিল্যান্ড | এলিজাহ জাস্ট | ক্রিস উড | নিউজিল্যান্ড ১–০ ইরান |
| ৩২ মিনিট | ইরান | রেজাইয়ান | একক প্রচেষ্টা | নিউজিল্যান্ড ১–১ ইরান |
| ৫৪ মিনিট | নিউজিল্যান্ড | এলিজাহ জাস্ট | ক্রিস উড | নিউজিল্যান্ড ২–১ ইরান |
| ৬৬ মিনিট | ইরান | মোহেবি | রেজাইয়ান | নিউজিল্যান্ড ২–২ ইরান |
মাঠের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্পোর্টিং মানসিকতা
আন্তর্জাতিক ফুটবল র্যাঙ্কিংয়ে ইরানের চেয়ে ৬৫ ধাপ পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও নিউজিল্যান্ড এই ম্যাচে অত্যন্ত লড়াকু ফুটবল উপহার দিয়েছে। ২০১০ সালের পর এবারই প্রথম তারা বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরে আসার গৌরব অর্জন করেছে। খেলার সপ্তম মিনিটেই লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামের গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দেয় নিউজিল্যান্ড। দলের অধিনায়ক ক্রিস উড ইরানের গোলরক্ষককে কাটিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সতীর্থ এলিজাহ জাস্টের দিকে বল বাড়িয়ে দেন। তিনি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের রক্ষণব্যূহের মাঝেই দারুণ এক ভলিতে গোল করে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে নেন।
এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে ইরান নিজেদের ছন্দ ফিরে পায়। খেলার ৩২তম মিনিটে রেজাইয়ান বুটের বাইরের অংশ দিয়ে চমৎকার চিপ শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। বিরতির পর খেলার ৫৪তম মিনিটে আবারও অধিনায়ক ক্রিস উডের চমৎকার পাসে নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন এলিজাহ জাস্ট। তবে নিউজিল্যান্ডের এই লিড মাত্র ১২ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। ৬৬তম মিনিটে ইরানকে সমতায় ফেরান মোহেবি। রেজাইয়ানের নিখুঁত ও দীর্ঘ পাস থেকে বল পেয়ে চমৎকার হেডের সাহায্যে তিনি বল প্রতিপক্ষের জালে জড়ান। এর পর দুই দলই বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করলেও কোনো দলই আর গোল করতে পারেনি। খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন ও করমর্দন করেন এবং জার্সি বদল করেন। ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোয়ি ডাগআউটে একা বসে থাকলেও মাঠের খেলোয়াড়রা পতাকা হাতে আসা হাজারো সমর্থককে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান।
