খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:৮ এএম

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র ফুটে উঠেছে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে অত্যন্ত জনাকীর্ণ অবস্থায় এবং পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে মুহাম্মদ আবদুল মজিদ (৫০) নামে এক যুবদল কর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। আজ বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে।
Table of Contents
নিহত মুহাম্মদ আবদুল মজিদ অলিমিয়াহাট বাজার এলাকারই স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে পায়ে হেঁটে নিজ বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিলেন মজিদ। তিনি বাজারের মূল অংশে পৌঁছানো মাত্রই মোটরসাইকেলে চড়ে একদল মুখোশধারী সশস্ত্র যুবক তাঁর পথরোধ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। মজিদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
গুলির শব্দে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় মজিদকে উদ্ধার করে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) টিবলু কান্তি দে জানিয়েছেন যে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আবদুল মজিদের মৃত্যু হয়েছিল। নিহতের শরীরে ঘাতকের বুলেটের একাধিক ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে।
| আঘাতের স্থান | গুলির সংখ্যা | অবস্থা |
| চোখের ওপরে (মাথা) | ১টি | মারাত্মক জখম |
| বুক | ১টি | ফুসফুস বিদ্ধ |
| কোমর | ১টি | গভীর ক্ষত |
| মোট | ৩টি | ঘটনাস্থলেই মৃত্যু |
নিহত মজিদের স্ত্রী শাহনাজ বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাঁর স্বামীর জীবন এর আগেও বিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ইতিপূর্বে একবার তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলা হলেও সে যাত্রায় তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সন্ত্রাসীরা তাঁকে আর রেহাই দেয়নি। পরিবারের দাবি, পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশের বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
রাউজান এলাকায় গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক সহিংসতার এক বিভীষিকাময় চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এই জনপদে লাশের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। গত ৫ জানুয়ারি ঠিক একই কায়দায় একই বাজারের অদূরে মুহাম্মদ জানে আলম নামের আরেক যুবদল নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল।
নিচে রাউজানের সাম্প্রতিক সহিংসতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
মোট হত্যাকাণ্ড: ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ২১টি।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা: নিহতদের মধ্যে ১৫ জনই রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা বলে দাবি করা হচ্ছে।
সহিংসতার ধরন: শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা।
আহত ও গুলিবিদ্ধ: সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ বিভিন্ন সময়ে পঙ্গুত্ব বরণ বা গুরুতর আহত হয়েছেন।
পুলিশি ব্যবস্থা: পূর্ববর্তী জানে আলম হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস পার হলেও এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বা মূল আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি প্রশাসন।
পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় এবং সুরক্ষিত এলাকায় বারবার এ ধরনের হত্যাকাণ্ড জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এই জনপদে খুনের সংস্কৃতি বন্ধ হচ্ছে না।
মন্তব্য