বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসা শিশু টিকাদান কর্মসূচি বর্তমানে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গাভি)-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে হাম-রুবেলার (MR) টিকা সরবরাহ করা হতো। তবে ‘সায়েন্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রচলিত ইউনিসেফ-নির্ভর ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল করে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়।
এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে টিকা সংগ্রহের বৈশ্বিক চেইন থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই ঝুঁকির বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। ফলস্বরূপ, রুটিন টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ে এবং দেশব্যাপী হামের এই মরণঘাতী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
Table of Contents
হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট ও মানবিক বিপর্যয়
হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। বিশেষ করে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন কনিকা আক্তার নামের এক মায়ের ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা ‘রিসা’ হামের সংক্রমণে প্রাণ হারায়। একই সময়ে তাঁর অপর কন্যা ‘রুহি’ মুমূর্ষু অবস্থায় আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এমন অসংখ্য পরিবারের আহাজারিতে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।
ভিটামিন-এ এর অভাব ও সংক্রমণের বিস্তার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রথম এই প্রাদুর্ভাবের লক্ষণ দেখা দেয়, যা দ্রুত দেশের ৫৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। হামের জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ অপরিহার্য হলেও এর সরবরাহ না থাকায় এবং শিশুদের অপুষ্টির কারণে মৃত্যুহার বহুগুণ বেড়ে গেছে।
আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা
এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের দায়ে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতি-নির্ধারকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দাখিল করেছেন, যেখানে টিকা সংগ্রহে অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান দাবি করেছেন যে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছিল, তবে জীবনদায়ী টিকার ক্ষেত্রে এমন মন্থর প্রক্রিয়া কেন অনুসরণ করা হলো, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি।
সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যে পূর্বের ভুল নীতি সংশোধন করে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বিপর্যয় সামাল দিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম বা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেনের মতে, প্রাদুর্ভাবের যে ভয়াবহ গতি, তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার কারণে গত কয়েক দশকের টিকাদান সাফল্য এখন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে। তাই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে কেবল টিকাদান নয়, বরং ভিটামিন-এ বিতরণ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।
