খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১১:৫২ পিএম

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শরীফকে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় স্ট্যান্ড রিলিজ বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। political পক্ষপাতিত্ব, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিসহ একাধিক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার সন্ধ্যায় সিএমপি সদরদপ্তরের এক জরুরি আদেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রত্যাহারের পর তাকে সিএমপির দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী এই বদলি আদেশ জারি করেন।
হঠাৎ করে একজন ওসির এমন দ্রুত অপসারণের ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার জন্য সিএমপির একজন উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রত্যাহারের নেপথ্যে রয়েছে সরকারের শীর্ষ মহলের একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার)। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠান। প্রতিমন্ত্রীর পাঠানো সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখার উপসচিব নাসরীন সুলতানা পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে বিষয়টি তদন্ত করে জরুরি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সেই চিঠি সিএমপি সদরদপ্তরে পৌঁছানোর পরপরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওসি মুহাম্মদ শরীফকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ওই চিঠিতে ওসির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং স্থানীয় তথ্য-упат্তের ভিত্তিতে ওসি মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্ত শেষ করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা দ্রুত মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তার বিগত কয়েক বছরের কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার বদলির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। পুরো ঘটনা ও তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি তথ্য নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্র. নং | বিষয়ের বিবরণ ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা | সংশ্লিষ্ট তারিখ ও তথ্য |
| ১ | বর্তমান পদ ও থানা (যেখান থেকে প্রত্যাহার) | ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), সদরঘাট থানা, সিএমপি |
| ২ | সদরঘাট থানায় যোগদানের তারিখ | গত ১৮ জুন |
| ৩ | দায়িত্ব পালনের মোট সময়কাল | মাত্র ১৭ দিন |
| ৪ | প্রত্যাহারের আদেশ জারির সময় | গত রোববার সন্ধ্যা |
| ۵ | আদেশ জারি করা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা | ওয়াহিদুল হক চৌধুরী (ভারপ্রাপ্ত কমিশনার, সিএমপি) |
| ৬ | বর্তমান সংযুক্তির স্থান | দামপাড়া পুলিশ লাইন্স, চট্টগ্রাম |
| ৭ | অভিযোগপত্র (ডিও লেটার) প্রদানকারী | মীর শাহে আলম (প্রতিমন্ত্রী, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়) |
| ৮ | মন্ত্রণালয়ের আদেশ প্রেরণকারী কর্মকর্তা | নাসরীন সুলতানা (উপসচিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ) |
| ৯ | তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমার মেয়াদ | আগামী ৭ কর্মদিবস |
| ১০ | সিটিএসবি থেকে এস্টেট শাখায় বদলির তারিখ | ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর |
নিজের বিরুদ্ধে আনা এই পাহাড়সম অভিযোগ অবশ্য পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ওসি মুহাম্মদ শরীফ। তার দাবি, তিনি কোনো ধরনের অন্যায় বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এর আগে কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে পেশাগত কারণে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সামাজিক অনুষ্ঠানের কিছু ছবি ব্যবহার করে একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধে মনগড়া অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও এই প্রতিবেদনের লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন সিএমপির এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডিং শাখা থেকে এক আদেশে মুহাম্মদ শরীফকে সদরঘাট থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। এর আগে তিনি সিএমপির ডিবি বা গোয়েন্দা শাখা থেকে কর্ণফুলী থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে, ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিটিএসবি থেকে তাকে এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডিং শাখায় বদলি করা হয়েছিল। দফায় দফায় এমন বদলি এবং শেষ পর্যন্ত যোগদানের ১৭ দিনের মাথায় প্রত্যাহারের এই ঘটনা সিএমপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য