খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৮:৫১ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যদি বর্তমান গতিতেই উচ্চমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রভান্ডারের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একই মাত্রায় অভিযান চললে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই উদ্বেগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অধ্যায় শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে যে পরিমাণ দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান মজুতকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, গত কয়েক দিনের মতো একই মাত্রায় যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত এমন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। তাঁর মতে, একটি বড় শক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংরক্ষণও তখন কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, সংঘাতের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ হামলা প্রতিহত করতে এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্রের অধিকাংশই উচ্চমূল্যের এবং দ্রুত উৎপাদন করা সম্ভব নয়।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলনের মূল্যায়নও একই ধরনের। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে এবং এটি সামরিক পরিকল্পনায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘাত থামার সময় পর্যন্ত পেন্টাগন তাদের থাড (THAAD) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছিল। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক এবং টমাহক ভূমি আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ নিক্ষেপ করা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ মজুত সম্পর্কে অবগত তিনটি পৃথক সূত্রও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
মার্ক কানসিয়ানের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ধীরগতি। চলতি অর্থবছরের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি নতুন টমাহক এবং প্রায় ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। ২০২৬ সালের জন্য নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহেরও পূর্বাভাস নেই। ফলে যুদ্ধকালীন ব্যবহারের তুলনায় নতুন উৎপাদনের হার অনেক কম।
সিএসআইএসের হিসাব বলছে, ইরান সংঘাত শুরুর আগের পর্যায়ের অস্ত্র মজুত পুনর্গঠনে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা বজায় থাকলে দ্রুত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণে মার্কিন কংগ্রেস এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়নি। ফলে নতুন অস্ত্র সংগ্রহ এখনও স্বাভাবিক বার্ষিক বাজেট ও ক্রয়প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি ইরান-সংক্রান্ত সামরিক ব্যয় মেটাতে হোয়াইট হাউস আইনপ্রণেতাদের কাছে সম্পূরক তহবিল চেয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কংগ্রেসে সেই প্রস্তাব অনুমোদন সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাত দ্রুত সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের গতি বাড়াতে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে গত জুনে ট্রাম্প প্রশাসন ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট কার্যকর করেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তিও করা হয়েছে।
তবে মার্ক কানসিয়ানের মতে, এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটালেও তাৎক্ষণিকভাবে সংকট কাটবে না। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সময় প্রয়োজন এবং যুদ্ধের মতো উচ্চমাত্রার ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরবরাহ বৃদ্ধি করা সহজ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে একই হারে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও কৌশলগত ভারসাম্য প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা এবং মিত্রদের সুরক্ষায় বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে। সে বাস্তবতায় বর্তমান মজুতের দ্রুত হ্রাস মার্কিন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য