খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিএনপি নেতা জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর (৫২) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, আটক ব্যক্তিরা ঢাকা থেকে ভাড়ায় এসে এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তিমূলক তথ্য দিয়েছেন। তবে হত্যার নেপথ্যের উদ্দেশ্য এবং কারা তাদের এ কাজে নিয়োগ দিয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিঠামইন সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাগানবাড়ির সামনে ধারালো অস্ত্রের হামলার শিকার হন জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে স্থানীয় বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া (৩৮) গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল আলমকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হাদিস মিয়া বর্তমানে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আটক ব্যক্তিরা হলেন বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর এলাকার নূর হোসেনের ছেলে মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার নাগমুদ বাজার মধ্যপাড়া এলাকার রহমত উল্লাহর ছেলে শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় তিন দিন আগে তারা ঢাকা থেকে মিঠামইনে আসেন এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালান। হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকেই একজনকে আটক করা হয়। পরে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে গভীর রাতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকারী এবং অর্থদাতাদের শনাক্ত করাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের পূর্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা অন্য কোনো মামলায় সম্পৃক্ততার বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সব দিক যাচাই-বাছাই করে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার সময় জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর ও হাদিস মিয়া মোটরসাইকেলে করে মিঠামইন সদর বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা তিন হামলাকারী ধারালো চাপাতি নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় জাহাঙ্গীরের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়।
আহত হাদিস মিয়ার বড় ভাই আজিজুল কবির জানান, হাদিস কোনো সাংগঠনিক পদে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হামলার সময় তিনি সাহসিকতার সঙ্গে একজন হামলাকারীকে জাপটে ধরে ফেলেন। তখন হামলাকারীরা তার মাথা, হাত ও পায়ে একাধিক কোপ দেয়। গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি আটক ব্যক্তিকে ছাড়েননি। পরে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে এসে ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
নিহত জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আলমগীর হোসেন জানান, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হবে।
এ হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা হত্যাকারীদের পাশাপাশি এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর সম্প্রতি আরেকটি আলোচিত ঘটনায়ও আলোচনায় এসেছিলেন। মিঠামইনের বেড়িবাঁধ এলাকায় সরকারি ২০টি মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। একই দিনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় তার দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব সাংগঠনিক পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। প্রায় এক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
পরে গত ৫ জুলাই তার সভাপতির পদে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট চিঠিটি তার মৃত্যুর পর জনসমক্ষে আসে, যা ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা, আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, আলামত সংগ্রহ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য