খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১২:৫ এএম

নরসিংদী জেলায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারী উদ্যোক্তার কাছে অবৈধভাবে চাঁদা দাবি এবং সেই কাঙ্ক্ষিত চাঁদার অর্থ না পেয়ে তাঁকে শারীরিকভাবে মারধর ও প্রকাশ্য শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভুক্তভোগী ওই নারী উদ্যোক্তা নিজেই বাদী হিসেবে উপস্থিত হয়ে নরসিংদীর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনি প্রতিকার চেয়ে এই নালিশি মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দায়ের করা এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে নামোল্লেখ করা হয়েছে মনোহরদী উপজেলা বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলনকে। এছাড়া মামলার এজাহারে উল্লেখিত অন্য দুই অভিযুক্ত আসামি হলেন একই উপজেলার অন্তর্গত হাররদিয়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল জব্বার এবং অর্জুনচর এলাকার বাসিন্দা মোক্তার উদ্দিন তালুকদার।
Table of Contents
মামলার সুনির্দিষ্ট বিবরণী এবং স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি, মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন এবং তাঁর অপরাপর সহযোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী উদ্যোক্তার কাছে জোরপূর্বক এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। ভুক্তভোগী ওই নারী তাদের এই অন্যায্য চাঁদার দাবি মেটাতে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানালে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে বিভিন্ন সময়ে ও নানা উপায়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন। এমনকি তাঁকে প্রাণনাশের মতো গুরুতর হুমকিও দেওয়া হতো বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ক্রমাগত হুমকির ধারাবাহিকতায় গত ৭ মে দুপুরের দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পূর্বপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে ওই নারীর নিজস্ব মালিকানাধীন ও পরিচালিত বিউটি পার্লারে জোরপূর্বক ও বেআইনিভাবে প্রবেশ করেন। পার্লারে প্রবেশ করার পর তারা পুনরায় সেই এক লাখ টাকা চাঁদা প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু নারী উদ্যোক্তা আবারও চাঁদা দিতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানালে আসামিরা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং একযোগে তাঁর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালান। শারীরিক অবস্থার তোয়াক্কা না করে অন্তঃসত্ত্বা ওই নারীকে একটি প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে নির্মমভাবে ও উপর্যুপরি পেটাতে থাকেন হামলাকারীরা। এই নিষ্ঠুর মারধরের একপর্যায়ে ওই ভুক্তভোগী নারী ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন প্রধান আসামি বিএনপি নেতা আমিনুর রহমান সরকার দোলন তাঁর পরনের কাপড়চোপড় টেনেহিঁচড়ে অত্যন্ত অমানবিক কায়দায় তাঁর শ্লীলতাহানি ঘটান। শুধু তাই নয়, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে আসামিরা ভুক্তভোগী নারীর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও বলপ্রয়োগ করে ছিনিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলেন।
আদালতে দায়ের করা নালিশি ওই মামলার এজাহারে শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অপরাধের পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নগদ অর্থ ও মূল্যবান অলঙ্কার লুটপাটের একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর মামলার বিবরণ অনুযায়ী, পার্লারের ভেতরে সংঘটিত মারধর ও তাণ্ডবের সময় আব্দুল জব্বার নামের মামলার দ্বিতীয় আসামি বিউটি পার্লারের ক্যাশ বাক্সের ড্রয়ারটি বলপ্রয়োগ করে ভেঙে ফেলেন। এরপর তিনি ড্রয়ারের ভেতরে সংরক্ষিত থাকা ব্যবসার নগদ ৫২ হাজার টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেন।
ঠিক একই সময়ে, সুযোগ বুঝে মামলার তৃতীয় আসামি মোক্তার উদ্দিন তালুকদার ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা নারীর গলায় পরিহিত আট আনা ওজনের একটি মূল্যবান স্বর্ণের হার অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে জোরপূর্বক টেনে ছিঁড়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেন। দিনের আলোতে সংঘটিত এই অতর্কিত হামলা এবং ভুক্তভোগী নারীর আত্মরক্ষার আকুতি ও গগনবিদারী চিৎকারে আশপাশের সাধারণ লোকজন ও ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা ভুক্তভোগী নারী এবং তাঁর পরিবারকে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করার এবং প্রাণনাশের চূড়ান্ত হুমকি প্রদান করে দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত লোকজন ওই আহত ও রক্তাক্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করেন এবং তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান, যেখানে তাঁকে নিবিড় চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
ভুক্তভোগী নারী উদ্যোক্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা শেষে শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি মনোহরদী থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু, ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, মনোহরদী থানা-পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রথমেই তাঁর মামলাটি সরাসরি রেকর্ড করতে বা এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এর পরিবর্তে তাঁরা তাঁকে ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে একটি সাধারণ লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, থানা-পুলিশের ওই পরামর্শ অনুযায়ী তিনি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো মামলা নথিভুক্ত করা হয়নি বা দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। থানায় দিনের পর দিন মামলা নিতে গড়িমসি করার কারণে চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে এবং পুলিশের কাছ থেকে কোনো ধরনের আইনি প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। গত ১৮ জুন তিনি নরসিংদীর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ন্যায়বিচারের আশায় এই নালিশি মামলাটি দায়ের করেন। আদালত তাঁর অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টির ওপর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনার সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন।
আদালতে দায়ের করা এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগ করা হলে প্রধান আসামি, মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক ভাষ্যমতে, বাস্তবে এই ধরনের কোনো মারধর, চাঁদা দাবি বা শ্লীলতাহানির ঘটনা আদৌ সংঘটিত হয়নি। তিনি দাবি করেন যে, মূলত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনীত পুরো অভিযোগটিই সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে থানায় মামলা নিতে গড়িমসি করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন মনোহরদী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর বাদশা। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এই ধরনের কোনো মারধর বা শ্লীলতাহানির ঘটনা সম্পর্কে তাঁর কাছে বিন্দুমাত্র কোনো তথ্য নেই এবং কোনো ভুক্তভোগী নারীও এই ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ নিয়ে তাঁর থানায় উপস্থিত হননি।
এই পুরো ঘটনাটি সম্পর্কে নরসিংদী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য মন্জুর এলাহী মন্তব্য করেছেন যে, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ময়দানে প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার এবং সামাজিকভাবে ঘায়েল করার হীন উদ্দেশ্যেই এই বানোয়াট মামলাটি দায়ের করা হয়ে থাকতে পারে। তবে একই সাথে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি, এবং সেই তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই কেবল এই বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য