যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভোক্তা ব্যয়ের ওপর পড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে পারিবারিক সঞ্চয়ের হারও দ্রুত কমে গিয়ে আর্থিক চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে বার্ষিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক আট শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ। মাসিক হিসাবেও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে গতি কিছুটা কমেছে। মার্চ মাসে ভোক্তা ব্যয় ছিল শূন্য দশমিক সাত শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে নেমে এসেছে শূন্য দশমিক চার শতাংশে।
অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ভোক্তা ব্যয়েও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে, যদিও এখনও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভোক্তা ব্যয়ের অংশ সবচেয়ে বড়। বাস্তব আয় কমে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ মেটানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানির দামে। পাশাপাশি খাদ্য, বিদ্যুৎ ও আবাসন খরচও বাড়ছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক তুলে ধরা হলো—
| সূচক | এপ্রিল মাসের অবস্থা | আগের মাসের অবস্থা |
|---|---|---|
| বার্ষিক মূল্যস্ফীতি | ৩.৮ শতাংশ | ৩.৫ শতাংশ |
| মাসিক ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি | ০.৪ শতাংশ | ০.৭ শতাংশ |
| প্রকৃত ভোক্তা ব্যয় | ০.১ শতাংশ | ১.০ শতাংশ |
| পারিবারিক সঞ্চয় হার | ২.৬ শতাংশ | ৪.৩ শতাংশ |
| প্রকৃত আয় পরিবর্তন | ঋণাত্মক ০.৫ শতাংশ | স্থিতিশীলের কাছাকাছি |
| অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (প্রথম প্রান্তিক) | ১.৬ শতাংশ | ০.৫ শতাংশ |
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে আয় বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে সাধারণ পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাচ্ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে সতর্ক করা হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যদিকে, কোর বা মৌলিক মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে, যেখানে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দেওয়া হয়। এই সূচক এপ্রিল মাসে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ বেড়েছে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে তা দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক তিন শতাংশে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কনীতি ও সরবরাহ চেইনের চাপও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ায় বিশ্বব্যাপী বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।
এদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা নিম্নমুখী হলেও ভোক্তা ব্যয় ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে সাময়িকভাবে অর্থনীতি গতি পাচ্ছে। তবে সামগ্রিক চিত্রে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনাও সীমিত থাকবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন এক জটিল পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে একদিকে ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে আয় ও সঞ্চয়ের পতন সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থাকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে।
