২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল, বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত চলমান সামরিক অভিযানের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। পেন্টাগনের শীর্ষ বাজেট কর্মকর্তা তথা কমপট্রোলার জে হার্স্ট হাউসের আইনপ্রণেতাদের উপস্থিতিতে এই তথ্য প্রদান করেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকার অধিক) ব্যয় হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধের এই বিশাল ব্যয়ের হিসাব এটিই প্রথম সরকারি স্বীকৃতি। আইনপ্রণেতাদের সামনে দেওয়া এই বিবৃতিতে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সংশ্লিষ্টতার একটি স্বচ্ছ চিত্র ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
অপারেশন এপিক ফিউরি: ব্যয়ের প্রধান খাতসমূহ
জে হার্স্ট তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক সামরিক অভিযানের অধীনে খরচ করা হয়েছে। তিনি ব্যয়ের গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান যে, খরচের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয়েছে যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ ব্যবস্থাপনায়। ব্যয়ের প্রধান খাতগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ: মোট ব্যয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মিসাইল, গাইডেড বোমা, ড্রোন এবং বিভিন্ন ক্যালিবারের গোলাবারুদ সরবরাহে। যুদ্ধের তীব্রতা বজায় রাখতে এই খাতের ব্যয় ছিল সর্বাধিক।
অপারেশন ও লজিস্টিকস: যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত সেনাদের আবাসন, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন এবং সামগ্রিক যুদ্ধের কৌশলগত কার্যক্রম পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট: দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে মোতায়েন থাকা যুদ্ধজাহাজ, আকাশে টহলরত যুদ্ধবিমান এবং সামরিক যানগুলোর জরুরি মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজে একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ ছিল।
মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব ও মধ্যবর্তী নির্বাচন
এই পরিসংখ্যান এমন এক সন্ধিক্ষণে প্রকাশিত হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য মাত্র ছয় মাস সময় বাকি। হাউসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকান পার্টির জন্য এখন জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য প্রকাশের ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে:
১. ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান: ডেমোক্র্যাটরা কৌশলগতভাবে এই ২৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়কে দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির সাথে যুক্ত করে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা এই যুদ্ধের আর্থিক প্রভাবকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে তুলনা করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। ২. রিপাবলিকানদের চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা কিছুটা এগিয়ে থাকায় রিপাবলিকানদের ওপর যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রমাণের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল ব্যয়ের সরকারি স্বীকৃতি ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।
সামরিক কৌশলের পরিবর্তন ও বর্তমান সংঘাতের ধরন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হামলা চালালেও বর্তমানে যুদ্ধের ধরনে গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্মুখ যুদ্ধের পরিবর্তে এখন উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে:
পারস্পরিক অর্থনৈতিক অবরোধ: উভয় দেশ একে অপরের আর্থিক কাঠামোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে কাবু করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল অর্থনীতিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বিপরীতে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
নৌ-অবরোধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা: মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এই নৌ-অবরোধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জে হার্স্ট কর্তৃক ঘোষিত ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই অংকটি কেবল প্রত্যক্ষ সামরিক খরচের প্রাথমিক হিসাব। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে এবং নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকে, তবে যুদ্ধের পরোক্ষ খরচ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি এই সীমানাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সাথে দুটি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে—একদিকে ইরানের কৌশলগত পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। পেন্টাগনের এই ব্যয় প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রশাসনের প্রতিরক্ষা বাজেটের পুনর্বিন্যাস এবং যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেবে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং রাজনৈতিক চাপ কীভাবে সামাল দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।
