খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ৫:৫২ পিএম

চট্টগ্রামের পটিয়ায় এক মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে (৮) দীর্ঘদিন ধরে পাশবিক নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা সামনে এসেছে। উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের ঈশ্বরখাইন চৌধুরীপাড়া আজিজিয়া নজিরিয়া তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসায় এই ঘটনা ঘটে। গত প্রায় এক বছর ধরে ওই শিশুর ওপর একই মাদ্রাসার এক শিক্ষক এবং তিন শিক্ষার্থী মিলে দফায় দফায় এই নির্যাতন চালিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শনিবার (৪ জুলাই) আজিজ উল্লাহ (২০) নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকেরা শুরু থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে ভুক্তভোগী শিশুটি নানা রকম শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল। প্রথমে তার চলাফেরা ও শারীরিক সমস্যা দেখে পরিবারের সদস্যরা মনে করেছিলেন সে হয়তো পাইলসজনিত কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এই ভেবে তারা শিশুটিকে স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এটি কোনো স্বাভাবিক রোগ বা পাইলস নয়। বরং শিশুটির ওপর নিয়মিত যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে তিনি তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেন।
চিকিৎসকের এমন মন্তব্যের পর পরিবারের লোকজনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তারা বাড়ি ফিরে শিশুটিকে পরম স্নেহে আশ্বস্ত করেন এবং বিস্তারিত জানতে চান। একপর্যায়ে অবুঝ শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং মাদ্রাসায় তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে। সে জানায়, মাদ্রাসার শিক্ষক আজিজ উল্লাহ তাকে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে আসছিলেন। আর এই জঘন্য কাজে মাদ্রাসারই অন্য তিন শিক্ষার্থী তাকে সরাসরি সহযোগিতা করত। গত প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই চারজন মিলে তার ওপর এই পাশবিক নিপীড়ন চালিয়ে আসছিল। লোকলজ্জা আর প্রাণভয়ের কারণে এতদিন সে বিষয়টি কাউকে বলতে সাহস পায়নি।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য পটিয়া থানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। পুলিশ জানায়, বিষয়টি টের পেয়ে মাদ্রাসার কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির লোকজন তড়িঘড়ি করে ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। তারা এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পরিবারটিকে নানাভাবে অনুরোধ জানান এবং বোঝানোর চেষ্টা করেন যেন কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। মামলা-মোকদ্দমা হলে মাদ্রাসার সুনাম নষ্ট হবে এবং প্রতিষ্ঠানটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন দোহাই দিয়ে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালান।
তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ এই ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুরো বিষয়টি জানার পরপরই পুলিশ অভিযানে নামে এবং অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি শিক্ষক আজিজ উল্লাহকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বাকি অভিযুক্ত তিন শিক্ষার্থীকে অতি দ্রুত থানায় হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আজিজ উল্লাহকে সন্দেহভাজন অপরাধী হিসেবে ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। লিখিত এজাহার বা মামলা জমা হওয়া মাত্রই গ্রেপ্তারকৃত আজিজ উল্লাহকে এই মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং বাকিদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুদের সুরক্ষায় এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মন্তব্য