খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই মে ২০২৬, ১২:১৬ এএম

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দুস্থদের মাঝে সরকারি ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কার্ডের চাল বিতরণের সময় ফেসবুক লাইভ করাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় নারী ও পুরুষসহ উভয় পক্ষের কমপক্ষে ৬০ জন ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে আজ শনিবার (৩০ মে) সকাল পর্যন্ত উপজেলার বাবলাতলা এলাকায় কয়েক দফায় এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা উৎসবের মাত্র দুইদিন আগে ভাঙ্গা উপজেলার ৮ নম্বর চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এলাকার অসহায় ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দকৃত সরকারি খাদ্য সহায়তা বা ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হচ্ছিল। চাল বিতরণের এই কার্যক্রম খেলা বা সচল থাকা অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম খান নামের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজস্ব আইডি থেকে লাইভ সম্প্রচার শুরু করেন।
তিনি তাঁর ফেসবুক লাইভে গরিব মানুষকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে সরকারি চাল কম দেওয়ার সরাসরি অভিযোগ তোলেন। একই সাথে তিনি লাইভ চলাকালীন সময়ে স্থানীয় administrations বা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এই চাল কম দেওয়ার ঘটনার সাথে জড়িতদের উদ্দেশ্য করে তীব্র গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই লাইভ সম্প্রচারের পর থেকেই স্থানীয় এলাকা জুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
Table of Contents
ফেসবুক লাইভে গালিগালাজ ও চাল কম দেওয়ার অভিযোগের জের ধরে গতকাল শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যার দিকে চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান সোহাগ মিয়ার ছোট ভাই চন্দনের সঙ্গে অভিযুক্ত আকরাম খানের তীব্র কথা-কাটাকাটি ও একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের লোকজন দ্রুত বাবলাতলা এলাকায় ঢাল, টেঁটা, রামদা ও ইটপাটকেলসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষে আকরাম খানের পক্ষে স্থানীয় শাহাবুদ্দিন মোল্লা এবং চেয়ারম্যানের ভাই চন্দনের পক্ষে চুমুরদী ইউপি চেয়ারম্যান সোহাগ মিয়া ও ইসরাফিলসহ তাদের শত শত সমর্থক ও অনুসারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে অংশ নেন। শুক্রবারের প্রথম দফার টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন মানুষ গুরুতর আহত হন।
এরপর আজ শনিবার সকালে দ্বিতীয় দফায় আবারও উভয় পক্ষ নতুন করে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সেখানে আরও ৩০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেছেন।
উভয় পক্ষের দাবি ও অভিযোগের বিবরণ:
ইউপি চেয়ারম্যান সোহাগ মিয়ার বক্তব্য: চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ মিয়া চাল চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আকরাম নামের ওই ব্যক্তি মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ছোট ভাইয়ের ভুয়া ও মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কোনো वैध ভিজিএফ কার্ড ছাড়াই চাল নিতে এসেছিলেন। কার্ড না থাকায় নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে চাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। চাল না পেয়ে তিনি প্রতিহিংসামূলকভাবে ফেসবুকে লাইভে গিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এর দুদিন পর আমার ছোট ভাই বাড়ি ফেরার পথে আকরামের মুখোমুখি হলে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তা দুই গ্রামের সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অভিযুক্ত আকরাম খানের বক্তব্য: অন্যদিকে আকরাম খান চাল চুরির দাবিতে অটল থেকে বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও গরিব মানুষকে মাত্র ৭ থেকে ৮ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছিল। এই জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে আমি সচেতন নাগরিক হিসেবে ফেসবুকে লাইভ করি। আমার লাইভ সম্প্রচার দেখে ভাঙ্গা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড স্যার নিজে এসে বিষয়টি তদারকি করে গেছেন এবং সত্যতা পেয়েছেন। কিন্তু চেয়ারম্যানের ভাই চন্দন এই ঘটনার জেরে আমাকে অহেতুক মারধর করায় দুই গ্রামের মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে সংঘর্ষে জড়ায়।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান মহাসড়ক ও গ্রামীণ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, ফেসবুক লাইভের ঘটনার পাশাপাশি মূলত স্থানীয় বিএনপির নতুন কমিটি গঠন এবং এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরোধ চলছিল, যা এই ঘটনার মাধ্যমে দুই দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়।
can-বিবৃতিতে ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ভাঙ্গা থানা পুলিশের একটি বিশাল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বর্তমানে বাবলাতলা ও চুমুরদী এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। ওসি আরও জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষের কাছ থেকেই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া হয়নি। কোনো পক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে পুলিশ তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বর্তমানে নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভিজিএফ বা ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি অধীনে অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত একটি বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের অতিদরিদ্র, দুঃস্থ, অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ও অসহায় পরিবারগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় খাদ্য সহায়তা প্রদান করা।
ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে সাধারণত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত মানের খাদ্যশস্য (যেমন: চাল) কার্ডধারী দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা কিংবা দেশের যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক ও জাতীয় দুর্যোগের পূর্ব মুহূর্তে সরকার কার্ডধারী প্রতিটি তালিকাভুক্ত পরিবারকে নির্দিষ্ট পরিমাণে (যা সাধারণত ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে) চাল বা অন্যান্য খাদ্য সহায়তা দিয়ে থাকে, যাতে দরিদ্র পরিবারগুলো সুখে উৎসব উদযাপন করতে পারে। ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নে এই ১০ কেজির চাল বিতরণকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে।
মন্তব্য