বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ঋণসীমা ও ব্যাংকিং নীতিতে বড় পরিবর্তন

দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য একক গ্রাহক ঋণসীমা বা এক্সপোজার লিমিট শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার ফলে বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে পূর্বের তুলনায় অধিক পরিমাণে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। মূলত এলপিজি আমদানিকারকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের ক্রমবর্ধমান ঋণের চাহিদা এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা নিরসনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরাসরি বা ফান্ডেড ঋণের নতুন নীতিমালা

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এখন থেকে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সরাসরি বা ফান্ডেড ঋণ একজন গ্রাহক বা একটি গ্রুপকে প্রদান করতে পারবে। এর আগে এই ঋণের সীমা ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। তবে শর্ত থাকে যে, ফান্ডেড এবং নন-ফান্ডেড (যেমন: এলসি বা ব্যাংক গ্যারান্টি) মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ কোনোভাবেই ব্যাংকের মোট মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

পূর্বে কোনো ব্যাংক তার মূলধনের ১৫ শতাংশ সরাসরি ঋণ এবং ১০ শতাংশ নন-ফান্ডেড সুবিধা দিতে পারত। নতুন নিয়মে সরাসরি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সর্বমোট ঋণের সর্বোচ্চ সীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

নন-ফান্ডেড ঋণের কনভার্সন ফ্যাক্টরে পরিবর্তন

আমদানিকারকদের সুবিধার্থে নন-ফান্ডেড ঋণের ক্ষেত্রে ‘কনভার্সন ফ্যাক্টর’ বা রূপান্তর হারের হিসেবে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। আগে ১০০ টাকার ঋণপত্র খুললে ৫০ টাকা মূল ঋণ হিসেবে গণ্য করা হতো (৫০ শতাংশ কনভার্সন ফ্যাক্টর), যা এখন কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে ১০০ টাকার ঋণপত্র খুললে গ্রাহকের ঋণসীমায় মাত্র ২৫ টাকা যোগ হবে। এর ফলে শিল্প গ্রুপগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যের ঋণপত্র খোলার সুযোগ পাবে।

এই সুবিধাটি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হবে:

  • ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত: ২৫ শতাংশ।

  • ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত: ৩০ শতাংশ।

  • ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত: ৪০ শতাংশ।

  • ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত: ৫০ শতাংশ।

  • ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে: আগের বিধান (৫০ শতাংশ) পুনরায় কার্যকর হবে।

খেলাপি ঋণের হার ও বৃহৎ ঋণের আনুপাতিক সীমা

ব্যাংকগুলোর জন্যও বৃহৎ ঋণ (Large Loan) বিতরণের শর্ত সহজ করা হয়েছে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মোট ঋণের কত শতাংশ বৃহৎ ঋণ হিসেবে দেওয়া যাবে, তার একটি নতুন তালিকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খেলাপি ঋণের হার (নতুন নিয়ম)বৃহৎ ঋণের সর্বোচ্চ সীমা (মোট ঋণের শতাংশ হিসেবে)পুরাতন নিয়ম (খেলাপি ঋণের হার)
১০ শতাংশ পর্যন্ত৫০%৩ শতাংশের কম
১০% এর বেশি কিন্তু ১৫% এর কম৪৬%৩% থেকে ৫% পর্যন্ত
১৫% এর বেশি কিন্তু ২০% এর কম৪২%৫% থেকে ১০% পর্যন্ত
২০% এর বেশি কিন্তু ২৫% এর কম৩৮%১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত
২৫% এর বেশি কিন্তু ৩০% এর কম৩৪%১৫% থেকে ২০% পর্যন্ত
৩০ শতাংশের বেশি৩০%প্রযোজ্য নয়

মূলধনের বিপরীতে মোট বৃহৎ ঋণের সীমা

নতুন নির্দেশনায় ব্যাংকের মোট বৃহৎ ঋণের পোর্টফোলিও নিয়েও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃহৎ ঋণ (সব গ্রাহক মিলিয়ে) প্রদান করতে পারত। এখন এই সীমা বাড়িয়ে ৬০০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা হলে, তারা সর্বমোট ৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বৃহৎ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এই নীতিমালার ফলে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো যারা ইতোমধ্যে আইনি সীমা অতিক্রম করে ঋণ গ্রহণ করেছে, তারা এখন নিয়মের মধ্যে চলে আসবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বৃহৎ ঋণের সীমা বাড়ানোর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে ঋণের প্রবাহ কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন এই নির্দেশনাসমূহ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।