বাঙালি সংস্কৃতির অবিনাশী আলোকবর্তিকা, শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চিরন্তন প্রতীক, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের পর এবারই প্রথম দেশজুড়ে অত্যন্ত গৌরবময় পরিবেশে তাঁর জন্মোৎসব উদযাপিত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের এই অবিসংবাদিত পুরুষকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করতে সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ণাঢ্য আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরাধীন ভারতবর্ষে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে কবি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে যে আলো ছড়িয়েছিলেন, তা আজও বাঙালিকে পথ দেখিয়ে চলেছে।
জন্মবৃত্তান্ত, শৈশবের দারিদ্র্য ও বহুমুখী জীবনসংগ্রাম
কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের শিক্ষার সূচনা ঘটেছিল স্থানীয় মক্তবে। কিন্তু পিতার অকালপ্রয়ানের পর চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। মাত্র ১০ বছর বয়সেই পরিবারের ভরণপোষণের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বালক নজরুল গ্রামীণ নাট্যদল বা লেটো দলে যোগ দেন। জীবনধারণের কঠোর সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে তিনি একপর্যায়ে মসজিদের মুয়াজ্জিন, মাজারের খাদেম এবং রুটির দোকানের কর্মী হিসেবেও কাজ করেন। পরবর্তীতে তরুণ বয়সে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে তিনি কলকাতা ফিরে আসেন এবং সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।
নিচে জাতীয় কবির জীবন পরিক্রমা ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের সংক্ষিপ্ত বিবরণী ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| জীবনের পর্যায় ও সময়কাল | যুক্ত থাকা ক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠান | সম্পাদিত কাজ ও ভূমিকা |
| শৈশব ও কৈশোর | চুরুলিয়া গ্রাম ও আসানসোল | মক্তবের ছাত্র, মাজারের খাদেম, রুটির দোকানের শ্রমিক |
| বাল্যকাল | গ্রামীণ লেটো নাট্যদল | পালাগান রচনা ও নাট্যদলের নিয়মিত সদস্য |
| তরুণ বয়স | ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী | সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ |
| পরবর্তী জীবন | সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গন | পেশাদার সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি |
সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টি, সুরের ভাণ্ডার ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ
বাল্যকালেই লেটো দলের জন্য গান ও নাটক রচনার মধ্য দিয়ে নজরুলের সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। তাঁর কালজয়ী কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তৎকালীন পাঠকসমাজে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং শোষক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কবির আপসহীন অবস্থানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। সমসাময়িক কালে রচিত তাঁর ‘কামাল পাশা’ কবিতাটিতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা এবং ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্পর্কে কবির আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। তবে নজরুলের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সংগীত। তিনি এককভাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রচনা করেছেন, যা সুরের বৈচিত্র্যে ও বাণীর গভীরতায় বাংলা গানের জগতে এক অনন্য সৃষ্টি। সংগীতে নতুন নতুন রাগ ও তালের সৃষ্টি করে তিনি সংগীতজগৎকে বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের প্রতিটি সৃষ্টিতে সাম্য, মানবতা ও চিরন্তন প্রেমের জয়গান গেয়েছেন। তিনি সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিচু শ্রেণির মানুষকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছেন এবং নারীর প্রতি প্রচলিত সামাজিক অবমাননার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ধার্মিক মুসলিম সমাজ ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সাথে সুগভীর আত্মিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি সাম্প্রদায়িকতার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। স্বার্থান্ধ মৌলবাদীদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে কবি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পক্ষে রাজপথে ও লেখনীর মাধ্যমে আন্দোলন করার কারণে কবিকে অসংখ্যবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। রাজকারাগারে রাজবন্দি হিসেবে অন্তরীণ থাকা অবস্থাতেই তিনি তাঁর ঐতিহাসিক জবানবন্দি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনা করেন।
নিচে কবির উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ও আদর্শিক দর্শনের বিবরণ ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো:
| সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র | কালজয়ী সৃষ্টিকর্মের নাম বা সংখ্যা | সৃষ্টির মূল উপজীব্য ও সামাজিক দর্শন |
| অনন্য কবিতাসমূহ | বিদ্রোহী, কামাল পাশা | অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সমকালীন বিশ্ব-ইতিহাস |
| সংগীত ভাণ্ডার | প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান | সুরের বৈচিত্র্য, ধ্রুপদী ভাবধারা ও নতুন রাগের উদ্ভাবন |
| কারাগারের সাহিত্য | রাজবন্দীর জবানবন্দী | ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা ও আত্মপক্ষ সমর্থন |
| সামাজিক চেতনা | সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ | অসাম্প্রদায়িকতা, নারী অধিকার রক্ষা ও মৌলবাদ প্রতিরোধ |
আকস্মিক অসুস্থতা, বাংলাদেশে স্থায়ী আগমন ও মহাপ্রয়াণ
কবির মহৎ জীবনটি ছিল নানা ঘাত-প্রতিঘাত, লাঞ্ছনা ও পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে পরিপূর্ণ। ১৯৪২ সালে তিনি এক মারাত্মক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং চিরতরে নিজের বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে যান। দীর্ঘকাল এই অসুস্থ অবস্থায় ভারতে কাটানোর পর, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে সসম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করে। কবির জীবনের শেষ দিনগুলো তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসায় অতিবাহিত হয়। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই হাসপাতালেই কবি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির পূর্বলিপ্সিত অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
