একই পরিবারে জন্ম, একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং একই শৈশব ভাগ করে নেওয়ার পরও ২০২৬ বিশ্বকাপে চার জোড়া ভাই ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আধুনিক ফুটবলে অভিবাসন, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাস্তবতার কারণে এমন দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। জাতীয় দলের ফুটবলে খেলোয়াড়দের পারিবারিক ও জাতীয় পরিচয়ের এই বৈচিত্র্য বিশ্বকাপকে আরও জটিল ও বৈশ্বিক চরিত্র দিচ্ছে।
এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত জুটি হিসেবে উঠে এসেছে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া দুই ভাই দেজিরে দুয়ে এবং গ্যুয়েলা দুয়ে। ছোট ভাই দেজিরে ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন এবং ক্লাব ফুটবলে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অন্যদিকে বড় ভাই গ্যুয়েলা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য বেছে নিয়েছেন পারিবারিক শিকড়ের দেশ আইভরি কোস্ট। এক প্রীতি ম্যাচে গ্যুয়েলার পারফরম্যান্স ও গোলের পর দুই ভাইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসে, যেখানে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও পারিবারিক বন্ধন অটুট থাকে।
স্পেনের উইলিয়ামস ভাইদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পারিবারিক বিভাজন দেখা যায়। নিকো উইলিয়ামস বর্তমানে স্পেন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে খেলছেন এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় তার পারফরম্যান্স ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। তার বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামস শুরুতে স্পেনের হয়ে খেললেও পরে ঘানার প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বর্তমানে আফ্রিকার এই দেশের জাতীয় দলে নিয়মিত খেলছেন।
ঘানা জাতীয় দলে আরও একটি পারিবারিক সম্পর্কের উদাহরণ রয়েছে ডেরিক লুকাশেন এবং ব্রায়ান ব্রবি। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া লুকাশেন ঘানার হয়ে খেলছেন, আর তার সৎভাই ব্রবি খেলছেন নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের হয়ে। একই পরিবারের দুই সদস্য দুই ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে।
স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। জন সুটার এবং হ্যারি সুটার দুই ভাই স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। জন সুটার স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন, আর হ্যারি সুটার অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এই ধরনের ঘটনা আধুনিক ফুটবলে ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপে দীর্ঘদিনের অভিবাসন প্রক্রিয়ার কারণে বহু খেলোয়াড়ের পারিবারিক শিকড় একাধিক দেশে বিস্তৃত। এর ফলে খেলোয়াড়রা জন্মস্থান, পারিবারিক ইতিহাস বা ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে জাতীয় দল নির্বাচন করতে পারেন। আফ্রিকার আলজেরিয়া, মরক্কো, সেনেগাল ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোর স্কোয়াডে ইউরোপে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের উপস্থিতি এর একটি বাস্তব উদাহরণ।
ভাইদের ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার ঘটনা আগেও ঘটেছে। ফুটবল ইতিহাসে জেরোম বোয়াটেং এবং কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেংয়ের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে একজন খেলেছেন জার্মানির হয়ে এবং অন্যজন ঘানার হয়ে। ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে তাদের মুখোমুখি লড়াই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে একসঙ্গে চার জোড়া ভাইয়ের ভিন্ন দেশের হয়ে অংশগ্রহণ ফুটবলের বৈশ্বিক চরিত্রকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। এটি কেবল খেলাধুলার বিষয় নয়, বরং সমসাময়িক বিশ্বের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলনও বটে।
ভাইদের জাতীয় দলভিত্তিক অংশগ্রহণ
| জুটি | খেলোয়াড় ১ | দেশ | খেলোয়াড় ২ | দেশ |
|---|---|---|---|---|
| ১ | দেজিরে দুয়ে | ফ্রান্স | গ্যুয়েলা দুয়ে | আইভরি কোস্ট |
| ২ | নিকো উইলিয়ামস | স্পেন | ইনিয়াকি উইলিয়ামস | ঘানা |
| ৩ | ডেরিক লুকাশেন | ঘানা | ব্রায়ান ব্রবি | নেদারল্যান্ডস |
| ৪ | জন সুটার | স্কটল্যান্ড | হ্যারি সুটার | অস্ট্রেলিয়া |
এই বাস্তবতা দেখায় যে আধুনিক ফুটবলে জাতীয় পরিচয়ের সীমারেখা আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে, যেখানে একই পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন দেশের হয়ে একই বিশ্বমঞ্চে অংশ নিচ্ছেন।
