ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যাঁদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে মতিলাল নেহরু অন্যতম। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী, দূরদর্শী রাজনীতিক এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পিতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও, নিজস্ব কৃতিত্ব ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জোরে তিনি ভারতীয় ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেন।
১৮৬১ সালের ৬ মে উত্তর প্রদেশের আগ্রায় তাঁর জন্ম। পিতা গঙ্গাধর নেহরু ছিলেন দিল্লির শেষ দিককার কোটওয়ালদের একজন। পারিবারিকভাবে শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবেশে বেড়ে ওঠা মতিলাল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত প্রথম প্রজন্মের ভারতীয়দের অন্যতম ছিলেন। তিনি এলাহাবাদের মিউর সেন্ট্রাল কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গমন করে ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন এবং অল্প সময়েই নিজেকে একজন দক্ষ ও প্রভাবশালী আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং আদালতে দৃঢ় উপস্থিতি তাঁকে কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতি এনে দেয়।
রাজনৈতিক জীবনে মতিলাল নেহরু ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন প্রধান নেতা। তিনি দুই দফায় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন—১৯১৯–১৯২০ এবং ১৯২৮–১৯২৯ সালে। তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস সংগঠনগতভাবে শক্তিশালী ও রাজনৈতিকভাবে সুসংহত হয়ে ওঠে। ১৯২০-এর দশকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে তিনি ‘স্বরাজ পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ দলের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ আইনসভায় প্রবেশ করে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে স্বশাসনের দাবি জোরদার করা।
১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন এবং একই বছরে কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত সর্বদলীয় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত ঐতিহাসিক ‘নেহরু রিপোর্ট’ ছিল ভারতের প্রথম সুসংগঠিত সাংবিধানিক খসড়া, যেখানে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস, মৌলিক অধিকার ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব রাখা হয়। যদিও ব্রিটিশ সরকার তা গ্রহণ করেনি, তবুও এটি পরবর্তী সাংবিধানিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।
নিম্নে তাঁর জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক উপস্থাপিত হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম | ৬ মে ১৮৬১, আগ্রা |
| পিতা | গঙ্গাধর নেহরু |
| পেশা | আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ |
| কংগ্রেস সভাপতি | ১৯১৯–১৯২০, ১৯২৮–১৯২৯ |
| উল্লেখযোগ্য দলিল | নেহরু রিপোর্ট (১৯২৮) |
| মৃত্যু | ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১, এলাহাবাদ |
পারিবারিক জীবনে মতিলাল নেহরু ছিলেন রূপো রানীর স্বামী এবং তিন সন্তানের জনক। জওহরলাল নেহরু পরবর্তীতে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। কন্যা বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং কৃষ্ণ হট্টীসিংহও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
এলাহাবাদে নির্মিত তাঁর বাসভবন ‘আনন্দ ভবন’ স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর পূর্বতন বাড়ি ‘স্বরাজ ভবন’ জাতীয় কংগ্রেসকে দান করেন, যা আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৩১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পরলোকগমন করেন। মতিলাল নেহরুর জীবন ছিল আত্মমর্যাদা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামে তাঁর অবদান ভারতীয় জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
