খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুন ২০২৬, ১:২৪ পিএম

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিপ্লবী এবং ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামী চেতনার প্রতীক আর্নেস্টো চে গুয়েভারার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো আজও ইতিহাস, কিংবদন্তি এবং নানামুখী বিতর্কের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার দুর্গম অরণ্যে তাঁর বন্দিত্ব ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছিল এক ঝোড়ো বিপ্লবী অধ্যায়ের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে তাঁর জীবনের সেই শেষ অধ্যায়ের হুবহু বর্ণনা উঠে আসে, যা বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছিল।
কথিত আছে যে, বলিভিয়ার সরকারি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা চে গুয়েভারার শেষ কথাগুলোর একটি ছিল, “গুলি কোরো না। আমি চে গুয়েভারা। মৃত চে গুয়েভারার চেয়ে জীবিত চে গুয়েভারা তোমাদের জন্য বেশি মূল্যবান।” আর্জেন্টিনার এক তরুণ চিকিৎসক থেকে বিশ্ববিপ্লবের কালজয়ী প্রতীকে পরিণত হওয়া এই মানুষটি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের মাথা উঁচু রেখেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।
Table of Contents
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ার এক অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে দেশটির সরকারি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চে গুয়েভারা এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াই সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধের এক পর্যায়ে চে গুয়েভারা পায়ে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন এবং আরেকটি গুলির আঘাতে তাঁর হাত থেকে ছিটকে পড়ে তাঁর ব্যবহৃত রাইফেলটি। চারদিক থেকে সরকারি সশস্ত্র সৈন্যরা তাঁকে ঘিরে ফেললে সেই মুহূর্তে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাঁর সামনে আর অন্য কোনো বিকল্প উপায় ছিল না।
ইতিহাসের পাতায় চে গুয়েভারা ছিলেন কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রধান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর অন্যতম প্রধান এবং বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। ১৯৫৯ সালে কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবের বিজয়ের পর কিউবার নতুন সরকারে এবং মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, উচ্চ পদ কিংবা বিলাসিতা কখনোই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল না। তাঁর মূল স্বপ্ন ছিল ভৌগোলিক সীমান্ত পেরিয়ে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। আর সেই বৈপ্লবিক স্বপ্নই তাঁকে একদা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে পুনরায় দক্ষিণ আমেরিকার গভীর অরণ্যে টেনে নিয়ে এসেছিল। বলিভিয়ার মাটিতে একটি ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন নিয়েই তিনি সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছিলেন, কিন্তু সেই মাটিতেই শেষ পর্যন্ত শেষ হয় তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্ময়কর জীবনযাত্রা।
গ্রেপ্তারের পর চে গুয়েভারাকে নিয়ে যাওয়া হয় বলিভিয়ার ছোট্ট প্রত্যন্ত শহর লা হিগুয়েরার একটি মাত্র কক্ষবিশিষ্ট সাধারণ বিদ্যালয়ে। সেখানে হাত-পা বাঁধা এবং ছেঁড়া ও ময়লাযুক্ত পোশাকে অত্যন্ত প্রতিকূল ও বন্দি অবস্থায় তাঁকে দেখতে পান তৎকালীন সময়ে নিজেকে বলিভীয় সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজ।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশেষ মহল চে গুয়েভারাকে জীবিত অবস্থায় বন্দি রেখে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। কিন্তু বলিভিয়ার তৎকালীন সামরিক শাসকগোষ্ঠী আশঙ্কা করেছিল যে, যদি চে গুয়েভারার প্রকাশ্য আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হয়, তবে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে আরও বড় জননায়কে পরিণত হবেন এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতি লাভ করবেন। এই রাজনৈতিক ও সামরিক আশঙ্কার কারণেই তাঁকে গোপনে অবিলম্বে হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীকালে এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিআইএ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজ বলেন, “আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। তিনিও আমার দিকে তাকালেন। তারপর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এটাই ভালো। আমি কখনো ভাবিনি জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ব।’ ” এটি ছিল ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও বিরল মুহূর্ত, যেখানে চরম শত্রু ও বন্দি একে অপরের সাথে করমর্দন এবং আলিঙ্গন করেছিলেন, অথচ তার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা নিশ্চিত ছিল। বিখ্যাত সাংবাদিক ও জীবনীকার জন লি অ্যান্ডারসন তাঁর রচিত সুপরিচিত গ্রন্থ ‘চে গুয়েভারা: আ রেভোলিউশনারি লাইফ’-এ উল্লেখ করেছেন যে, চে গুয়েভারাকে সরাসরি গুলি করার মূল দায়িত্বটি প্রদান করা হয়েছিল বলিভীয় সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট জাইমে তেরানকে।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চে গুয়েভারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাঁর জল্লাদকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি জানি তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ। গুলি করো। তুমি কেবল একজন মানুষকেই হত্যা করতে যাচ্ছ।” এরপর একাধিক গুলিতে ঝাঁঝরা করা হয় তাঁর শরীর। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর যখন তাঁর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৯ বছর।
চে গুয়েভারার জীবনাবসান, তাঁর জন্ম-মৃত্যুর তারিখ এবং পরবর্তী মূল প্রশাসনিক ও সামরিক ঘটনাবলী নিচে টেবিলের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| পর্যালোচনার বিষয় ও ইতিহাস | সংশ্লিষ্ট নিখুঁত তথ্য ও উপাত্ত |
| পূর্ণ নাম ও বৈশ্বিক পরিচিতি | আর্নেস্টো চে গুয়েভারা (বিপ্লবী ও চিকিৎসক) |
| জন্ম তারিখ ও স্থান | ১৪ জুন, ১৯২৮ বছর; আর্জেন্টিনা |
| মৃত্যু তারিখ ও স্থান | ৯ অক্টোবর, ১৯৬৭ বছর; লা হিগুয়েরা, বলিভিয়া |
| মৃত্যুকালে বয়স | ৩৯ বছর |
| আটকের তারিখ ও স্থান | ৮ অক্টোবর, ১৯৬৭ বছর; বলিভিয়ার পাহাড়ি জঙ্গল |
| প্রধান রাজনৈতিক ভূমিকা | কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে ফিদেল কাস্ত্রোর প্রধান সহযোদ্ধা |
| মরদেহ প্রদর্শনের স্থান | ভ্যালেগ্রান্দে গ্রামের একটি হাসপাতালের ধোয়াঘরের সিঙ্ক |
| শনাক্তকরণের বিশেষ প্রক্রিয়া | আঙুলের ছাপ পরীক্ষার জন্য দুটি হাত কেটে সংরক্ষণ করা |
| জীবনীগ্রন্থ ও লেখক | ‘চে গুয়েভারা: আ রেভোলিউশনারি লাইফ’ (জন লি অ্যান্ডারসন) |
শারীরিক মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক যাত্রা। তাঁর মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করতে বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী তাঁর মরদেহ ভ্যালেগ্রান্দে গ্রামের একটি স্থানীয় হাসপাতালের ধোয়াঘরের সিঙ্কে এনে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। সেই সময় বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁর নিথর দেহের বিখ্যাত আলোকচিত্রগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের কাছে সেই ছবিগুলো যেন ক্রুশবিদ্ধ যীশু খ্রিস্টের ঐতিহাসিক যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতির পুনরুত্থান ঘটিয়েছিল।
প্রশাসনিকভাবে তাঁর শতভাগ পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বলিভীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁর শরীর থেকে দুটি হাত কেটে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে পরবর্তীতে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা সহজ হয়। এরপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাঁকে বলিভিয়ার মাটিতে একটি অজ্ঞাত গণকবরে সমাহিত করা হয়।
চে গুয়েভারার মৃত্যুর খবর বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শ ও কিংবদন্তির কোনো মৃত্যু ঘটেনি। বরং মৃত্যুর পরেই তিনি বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং বিপ্লবী স্বপ্নের এক অমর ও চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর কিউবার রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল কাস্ত্রো এক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও আবেগঘন রাষ্ট্রীয় ভাষণে বলেছিলেন, “যারা মনে করছে চে গুয়েভারার মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয়েছে, তারা চরম ভুল করছে।” পরবর্তী দীর্ঘ সময় ও বিশ্ব ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে কাস্ত্রোর সেই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য ছিল। কারণ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে হত্যা করা সম্ভব হলেও, মানুষের মনের ভেতরের মুক্তির স্বপ্নকে কখনো হত্যা করা সম্ভব নয়। একটি শরীরকে মাটির নিচে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু একটি বৈপ্লবিক আদর্শকে কখনো মুছে ফেলা যায় না। আজ পৃথিবীর বহু বছর পরেও নানা প্রান্তে মানুষের বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চে গুয়েভারা এক অনির্বাণ প্রেরণার নাম।
মন্তব্য