খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই মে ২০২৬, ১১:৭ এএম

দেশের বিদ্যুৎ খাতের অভিভাবক সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যে এক অভিনব ও বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে। গত ৪ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে জমা দেওয়া এই প্রস্তাবে কেবল সরাসরি ইউনিট প্রতি দাম বাড়ানোর কথাই বলা হয়নি, বরং আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিদ্যমান বিলের ধাপ বা ‘স্ল্যাব’ পরিবর্তনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। পিডিবির এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে দেশের একটি বিশাল অংশের গ্রাহক, বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়বে।
Table of Contents
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যমান বিলিং কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা হতে পারে। বর্তমানে গ্রাহকেরা যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, ধাপে ধাপে তাঁদের বিলের হার তত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পিডিবির নতুন কৌশল হলো প্রথম ৭৫ ইউনিটের সুবিধা বাতিল করা। বর্তমানে যারা ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য কম দামের (প্রথম ধাপ) সুবিধা পান। প্রস্তাবিত নীতি অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলেই তার পুরো ব্যবহার্য বিদ্যুৎ দ্বিতীয় ধাপের উচ্চমূল্যে হিসাব করা হবে।
নিচে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের মাসিক বিলের সম্ভাব্য পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিবরণ | বর্তমান নিয়ম (টাকা) | প্রস্তাবিত নিয়ম (টাকা) | বৃদ্ধির পরিমাণ (টাকা) |
| প্রথম ৭৫ ইউনিট (প্রতি ইউনিট ৫.২৬ টাকা) | ৩৯৪.৫০ | প্রযোজ্য নয় | – |
| অবশিষ্ট ১২৫ ইউনিট (প্রতি ইউনিট ৭.২০ টাকা) | ৯০০.০০ | প্রযোজ্য নয় | – |
| মোট ২০০ ইউনিট (ধাপ পরিবর্তন অনুযায়ী) | ১,২৯৪.৫০ | ১,৪৪০.০০ | ১৪৫.৫০ |
| মূল্যবৃদ্ধি সহ ২০০ ইউনিট (প্রতি ইউনিট ৮.২০ টাকা) | ১,২৯৪.৫০ | ১,৬৪০.০০ | ৩৪৫.৫০ |
এই পরিবর্তনের ফলে শুধু আবাসিক খাতেই বছরে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে পিডিবি।
পিডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ এই নতুন প্রস্তাবের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রাহক বিন্যাসের তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
লাইফলাইন গ্রাহক (০-৫০ ইউনিট): মোট গ্রাহকের ৪৩ শতাংশ। এদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়নি।
প্রথম ধাপ (৫১-৭৫ ইউনিট): মোট গ্রাহকের ২২ শতাংশ। এদেরও দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ (৭৬-২০০ ইউনিট): এই শ্রেণিতে গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৮ হাজার ৬৬২ জন। পিডিবির এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য এই বিশাল সংখ্যক নিম্ন-মধ্যবিত্ত গ্রাহক।
উচ্চ ধাপ (২০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে): বাকি ১২ শতাংশ গ্রাহক ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
পিডিবির চেয়ারম্যানের মতে, জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানির খরচ মেটানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য এই সমন্বয় অনিবার্য। গত কয়েক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদন ও জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
দাম বাড়ানোর পাশাপাশি পিডিবি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেছে:
১. স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা কমলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুতের দামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে।
২. দ্বিবার্ষিক সমন্বয়: বছরে দুইবার বিদ্যুতের দাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩. দীর্ঘমেয়াদী ট্যারিফ: আগামী কয়েক বছরের জন্য অগ্রিম দামের ধারণা প্রদান করা যাতে গ্রাহকেরা প্রস্তুতি নিতে পারেন।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উৎপাদনের অপ্রয়োজনীয় খরচ না কমিয়ে সাধারণ গ্রাহকের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে। ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রে ৪০-৫০ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এ ছাড়া চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি থাকায় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বিলের ধাপ পরিবর্তনের এই প্রস্তাব লুণ্ঠনমূলক এবং এটি নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বিইআরসি আগামী ২০ ও ২১ মে এই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি গ্রহণ করবে। ১ জুন থেকে নতুন এই বর্ধিত দাম কার্যকরের পরিকল্পনা করছে পিডিবি, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে কমিশনের কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন ও শুনানির ফলাফলের ওপর। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মন্তব্য