খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জানুয়ারি ২০২৬, ২:৪৫ এএম

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজপথে বিএনপির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন করার পর অবশেষে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিচ্ছেদের পথে হাঁটল মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন ‘নাগরিক ঐক্য’। আসন সমঝোতায় বিএনপির অনড় অবস্থান এবং শেষ মুহূর্তে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে দলটি এককভাবে নির্বাচনি ময়দানে নামার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। নিজস্ব প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ দলের মোট ১১ জন প্রার্থী এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিচ্ছেদ জোটবদ্ধ আন্দোলনের ভবিষ্যতে এক বড় ধরনের ফাটল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
Table of Contents
বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) এবং ঢাকা-১৮ আসন দুটি। গত ২৪ ডিসেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে মিত্রদের জন্য ১০টি আসনে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে বগুড়া-২ আসনে মান্নাকে সমর্থনের কথা উল্লেখ ছিল। তবে নাটকীয়ভাবে বিএনপি সেই আসনে তাদের নিজস্ব নেতা শাহে আলমকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বরাদ্দ দেয়। অন্যদিকে, মান্না ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও সেখানেও বিএনপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রার্থী করে। মিত্র দলের শীর্ষ নেতাকে এভাবে নির্বাচনি অনিশ্চয়তায় ফেলায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে নাগরিক ঐক্য এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নির্বাচনি ডামাডোলের মাঝেই মাহমুদুর রহমান মান্না হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, অসুস্থ থাকা অবস্থায় বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে একটি বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবটি ছিল এমন যে—যদি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, তবে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাঁকে সরাসরি মন্ত্রী বানানো হবে। এই প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে মান্না বলেন, “রাজনীতি মানেই যেহেতু বর্তমানে নির্বাচন, তাই আমি নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হওয়ার আশ্বাসে রাজনীতি বন্ধ করা মানে ভিক্ষা নেওয়া, যা আমি কখনো করব না।”
নাগরিক ঐক্যের চূড়ান্ত নির্বাচনি ছক:
| প্রার্থীর নাম | নির্বাচনি আসন | দলীয় পদবি ও প্রতীক |
| মাহমুদুর রহমান মান্না | ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ | সভাপতি (কেটলি প্রতীক) |
| মোফাখখারুল ইসলাম | রংপুর-৫ | প্রেসিডিয়াম সদস্য |
| নাজমুস সাকিব আনোয়ার | সিরাজগঞ্জ-১ | যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক |
| মো. কবির হাসান | জামালপুর-৪ | যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক |
| শাহনাজ রানু | পাবনা-৪ | অর্থ বিষয়ক সম্পাদক |
| মেজর (অব.) আব্দুস সালাম | কুড়িগ্রাম-২ | কেন্দ্রীয় নেতা |
| মোহাম্মদ সামছুল আলম | রাজশাহী-২ | কেন্দ্রীয় নেতা |
| স্বপন মজুমদার | চট্টগ্রাম-৯ | কেন্দ্রীয় সদস্য |
| মোহাম্মদ রেজাউল করিম | লক্ষ্মীপুর-২ | কেন্দ্রীয় নেতা |
২০১৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রায় প্রতিটি আন্দোলন ও প্ল্যাটফর্মে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বিএনপির বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে দেখা গেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অধীনে তিনি ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে লড়েছিলেন। পরবর্তীতে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ গঠনের মাধ্যমে যুগপৎ আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। তবে নির্বাচনি পিঠপিঠ সময়ে বড় দল হিসেবে বিএনপির ‘একলা চলো’ নীতি এবং মিত্রদের মূল্যায়নে অনীহা কেবল নাগরিক ঐক্য নয়, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি-কেও আলাদা পথে ঠেলে দিয়েছে।
‘বদলে দাও বাংলাদেশ’—স্লোগান সামনে রেখে নাগরিক ঐক্য এখন তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে। যদিও বিএনপির সঙ্গে এই বিচ্ছেদকে মান্না ‘আপাত সমাপ্তি’ হিসেবে দেখছেন, তবে নির্বাচনি মাঠে ‘কেটলি’ প্রতীকের এই সক্রিয়তা সমমনা দলগুলোর ভোট ব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে। উত্তরা ও শিবগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে মান্নার উপস্থিতি নির্বাচনি সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত স্বার্থ বা মন্ত্রিত্বের প্রলোভনের চেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে এই বিচ্ছেদ কেবল একটি নির্বাচনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর টিকে থাকার ও নিজেদের মর্যাদা রক্ষার এক লড়াই।
মন্তব্য