ভারতের উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলায় থানা চত্বরের অভ্যন্তরে এক নৃশংস ও অমানবিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পরিবারের অমতে নিজের পছন্দের মানুষকে ভালোবেসে বিয়ে করার অপরাধে খোদ থানার ভেতরেই মা-বাবার নির্মম হামলার শিকার হয়েছেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর শিবানী নামের ওই তরুণী মারা যান। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা গেছে।
Table of Contents
ঘটনার পটভূমি ও আইনি জটিলতা
পুলিশের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তথ্যানুযায়ী, নিহত তরুণীর নাম শিবানী (১৯)। গত ১৮ মে শিবানী তাঁর প্রতিবেশী যুবক ললিত বর্মার সঙ্গে ঘর ছাড়েন। পরিবারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাঁরা নিজেদের পছন্দে একটি মন্দিরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পরবর্তীতে আইনি উপায়ে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) সম্পন্ন করেন। তবে শিবানীর পরিবার এই বিয়ে কোনোভাবেই মেনে নিতে স্বীকৃতি দেয়নি। উল্টো ললিত বর্মার বিরুদ্ধে শিবানীকে জোরপূর্বক অপহরণের অভিযোগ এনে স্থানীয় থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করে তাঁর পরিবার।
kidnapping বা অপহরণের মামলা দায়েরের পর স্থানীয় পুলিশ নিখোঁজ এই দম্পতির সন্ধান শুরু করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর গত শুক্রবার এক গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পার্শ্ববর্তী রাজ্য মধ্য প্রদেশের সাতনা জেলা থেকে ললিত ও শিবানীকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর পুলিশ তাঁদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উত্তর প্রদেশের বান্দা থানায় নিয়ে আসে।
থানায় জবানবন্দি ও সমঝোতা বৈঠক
বান্দা থানায় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে ললিত ও শিবানী উভয়েই পুলিশকে স্পষ্ট জানান যে, তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং সম্পূর্ণ নিজেদের স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। নিজেদের দাবির সপক্ষে তাঁরা মন্দিরে বিয়ের ছবি এবং আইনি নিবন্ধনের যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র পুলিশের কাছে জমা দেন।
থানা কর্তৃপক্ষ যখন শিবানীর আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি রেকর্ড করা এবং তাঁর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখন এই খবর পেয়ে দুই পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে উপস্থিত হন। থানার ভেতরে উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে পুলিশ দুই পক্ষকে নিয়ে একটি সমঝোতা বৈঠকে বসে।
উক্ত বৈঠকে শিবানীর মা-বাবা তাকে ললিতের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে অবিলম্বে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য ক্রমাগত মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। কিন্তু ১৯ বছর বয়সী শিবানী নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গেই থাকবেন এবং তাঁর সঙ্গেই সংসার পরিচালনা করবেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শিবানী ও তাঁর মা-বাবার মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
থানার ভেতরে আকস্মিক হামলা ও মৃত্যু
কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ জানায়, আলোচনার মাঝখানেই হঠাৎ শিবানীর মা রান্নো দেবী পেছন থেকে নিজের মেয়ে শিবানীকে শক্ত করে জাপটে ধরেন যেন তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন। মায়ের এই সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে শিবানীর বাবা তাৎক্ষণিকভাবে নিজের পকেট থেকে একটি অত্যন্ত ধারালো ছুরি বের করে মেয়ের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
থানায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতেই শিবানীর পেট, হাত এবং হাতের তালুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন তাঁর বাবা। পুলিশের ঘরের ভেতরে চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই আচমকা ও নৃশংস হামলায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সাময়িকভাবে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
মেয়ের ওপর হামলা সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ দ্রুত রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় শিবানীকে উদ্ধার করে এবং চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠায়। তবে ধারালো ছুরির আঘাত অত্যন্ত গভীর ও আশঙ্কাজনক হওয়ায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শিবানীর মৃত্যু হয়।
পুলিশের বক্তব্য ও আইনগত পদক্ষেপ
এই চাঞ্চল্যকর ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বান্দা জেলার পুলিশ সুপার পলাশ বনশল সংবাদমাধ্যমকে সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এবং পুলিশের উপস্থিতিতে এই ধরনের অপরাধ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর পরই সংশ্লিষ্ট আইনি ধারায় একটি হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত পিতাকে সশরীরে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে একটি গভীর তদন্ত প্রক্রিয়া চালু রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
