ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি “স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয় পথ” নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না সৌদি আরব। মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN–এর এক প্রতিবেদনে দেশটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানও ইসরায়েলের সঙ্গে স্বীকৃতি বা সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব তার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক নীতিতে অনড় রয়েছে। রিয়াদের অবস্থান অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পর্ক স্থাপন অবশ্যই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের (Two-State Solution) সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই অবস্থানটি এমন সময়ে সামনে আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইঙ্গিত দেন যে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে কোনো চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য “আব্রাহাম অ্যাকর্ডস”-এ যুক্ত হতে পারে।
ট্রাম্প একইসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে এমন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে যা “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে শক্তিশালী” হবে। এর আগে তিনি একাধিকবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, যা তার প্রশাসনের সময় ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত।
CNN–এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছরের নভেম্বর মাসে এক বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগদানের বিষয়ে অনুরোধ করেন। তবে জবাবে ক্রাউন প্রিন্স স্পষ্ট করেন, সৌদি আরব এই উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহী হলেও তার জন্য শর্ত হচ্ছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট রূপরেখা এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বাস্তব অগ্রগতি।
মোহাম্মদ বিন সালমান ওই আলোচনাকে “গঠনমূলক” বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করতে সৌদি আরব সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। রিয়াদের এই অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে পরিচিত, যেখানে ফিলিস্তিন ইস্যুকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থানও একই ধরনের নীতিগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দেওয়া উচিত নয়। তিনি পাকিস্তানের গণমাধ্যম সামা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এমন কোনো চুক্তিতে অংশ নেওয়া পাকিস্তানের “মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক”।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নীতি অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমানার ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এই অবস্থানের কারণে পাকিস্তানি পাসপোর্টধারীদের জন্য ইসরায়েলে ভ্রমণও সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের উদ্যোগে পুনরায় সক্রিয় হলেও ফিলিস্তিন ইস্যু উপেক্ষা করে সৌদি আরব এবং পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন পাকিস্তানের মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি অর্জন করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন প্রশ্নে সুস্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া এই অঞ্চলের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হওয়া কঠিন বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
