খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুন ২০২৬, ১:২০ পিএম

ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে সোমবার সকালে এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকে থাকায় এবং উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই প্রাণহানির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ফিলিপাইন সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কার্যালয়ের পরিচালক রদ্রিগো সসমিনা জানান, প্রাথমিকভাবে ১২ জনের প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া গেছে, যাঁরা সবাই দেশটির চার প্রদেশ ও একটি শহর জুড়ে বিস্তৃত সকসসারজেন অঞ্চলের বাসিন্দা। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের কারণে ওই অঞ্চলে কমপক্ষে ১২৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাঁদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
Table of Contents
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) এর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৮। তবে এই সংস্থাটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ৮ দশমিক ২ বলে উল্লেখ করেছিল, যা পরবর্তীতে সংশোধন করা হয়। অন্যদিকে, ফিলিপাইনের নিজস্ব ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি বিষয়ক সংস্থা ‘ফিভলকস’ জানিয়েছে যে রিখটার স্কেলে এই কম্পনের তীব্রতা ছিল ৭। প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপদার্থবিজ্ঞান সংস্থা (বিএমকেজি) তাদের পরিমাপে এই ভূমিকম্পের তীব্রতা ৭ দশমিক ৭ বলে উল্লেখ করেছে। জিএফজেড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শক্তিশালী ভূকম্পনটির উৎপত্তি ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে, যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তীব্র হয়েছে।
| সংস্থার নাম | দেশের নাম | রিখটার স্কেলে তীব্রতা |
| জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) | জার্মানি | ৭ দশমিক ৮ (প্রথমে ৮ দশমিক ২) |
| ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপদার্থবিজ্ঞান সংস্থা (বিএমকেজি) | ইন্দোনেশিয়া | ৭ দশমিক ৭ |
| ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলোজি অ্যান্ড সিসমোলজি (ফিভলকস) | ফিলিপাইন | ৭ |
ভূমিকম্পের তীব্র আঘাতে মিন্দানাও দ্বীপের বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশের জেনারেল সান্তোস শহরের পুলিশের মাস্টার সার্জেন্ট রবার্ট দাগোন পরিস্থিতি বর্ণনা করে জানান, ভূমিকম্পের ধাক্কায় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন এবং অসংখ্য আবাসিক বাড়িঘর ধসে পড়েছে। অনেক সরকারি-বেসরকারি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং উদ্ধারকারী দলগুলো এই মুহূর্তে সম্পূর্ণভাবে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সব ভবনের নাম বা সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফিলিপাইনের দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের একজন কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, জেনারেল সান্তোস শহরে অন্তত পাঁচ ব্যক্তির মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।
ফিলিপাইনের সারাঙ্গানি প্রদেশের আলাবেল শহরের পুলিশ প্রধান বেনজি আনচেতা ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, সোমবার সকালে যখন প্রাত্যহিক পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান চলছিল, ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে এই তীব্র ভূকম্পন অনুভূত হয়। কম্পনটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর পরপরই স্থানীয় পুলিশ ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। তিনি এই দুর্যোগকে তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্প বলে আখ্যায়িত করেছেন। ফিলিপাইনের বাইরে প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার উত্তরের শহর মানাদোর প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানিয়েছেন যে, সেখানে অত্যন্ত তীব্র ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এই শক্তিশালী ভূকম্পনের পরপরই ফিলিপাইন এবং প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়ার ভূপদার্থবিজ্ঞান সংস্থাগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থাও এই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কায় সুনামির ঝুঁকির আগাম সতর্কতা জারি করেছে। ফিলিপাইনের সংস্থা ‘ফিভলকস’ তাদের বিশেষ সতর্কবার্তায় বলেছে, ভূমিকম্পের গভীরতা ও তীব্রতার কারণে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, সমুদ্র উপকূলে এক মিটারের বেশি উচ্চতার সুনামি বা জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে এবং এই পরিস্থিতি কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে উপকূলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া উভয় দেশই অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশ দুটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিবলয়ের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলটি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে শুরু করে এশিয়ার জাপান হয়ে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত, যা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং তীব্র ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।
মন্তব্য