খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ৩:৫৩ পিএম

প্রেমের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ার জেরে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৈকত হাসান আকাশ হত্যাকাণ্ডে দুই ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে অপর দুই আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত) মো. সামছুদ্দিন বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এই রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন সদর উপজেলার ভূগলী নয়াপাড়া গ্রামের নাজমুল হক (২৬) ও তার ভাই এনামুল হক। দণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই ব্যক্তি হলেন তাদের বাবা জিয়াউল হক (৫৭) এবং চাচা জুলহাস উদ্দিন (৩৭)।
রায় ঘোষণার সময় নাজমুল হক, জিয়াউল হক ও জুলহাস উদ্দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এনামুল হক পলাতক থাকায় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী উপস্থিত তিন আসামিকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে রায়ের পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আবু হানিফ খান। অন্যদিকে আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম খান।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত সৈকত হাসান আকাশ সদর উপজেলার অষ্টধার উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জিয়াউল হকের মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মেয়ের পরিবার ওই সম্পর্ক মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তদন্তে উঠে আসে, এই সম্পর্কের জের ধরেই আকাশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের ১৯ মে রাতে মেয়েটিকে দিয়ে আকাশকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অপরাধের আলামত গোপন করার উদ্দেশ্যে মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়, যাতে ঘটনাটি দীর্ঘ সময় ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায়।
আকাশ বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। নিখোঁজের দুই দিন পর, ২১ মে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে।
ঘটনার পরদিন নিহতের বাবা মো. আকরাম হোসেন ২২ মে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় ১৪ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত চলাকালে পুলিশ সাক্ষ্য-প্রমাণ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি আদালতে চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
এরপর মামলাটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। আদালতে একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, উপস্থাপিত প্রমাণ যাচাই এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির পর আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় ঘোষণা করেন।
ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক পি.এস.এম. মোস্তাছিনুর রহমান জানান, আদালতে উপস্থিত তিন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে রায় ঘোষণার পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পলাতক এনামুল হককে গ্রেপ্তার করা গেলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিহত আকাশের পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হবে এবং পলাতক আসামিকেও দ্রুত আইনের আওতায় এনে দণ্ড কার্যকর করা হবে।
মন্তব্য