পাসপোর্ট অফিসে ঘুস সিন্ডিকেটের বিস্তৃত চিত্র

পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঘুস চক্রের বিস্তারিত চিত্র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যেখানে দালালচক্র, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ব্যবস্থায় ‘চ্যানেল মাস্টার’ নামে পরিচিত একজন বিশেষ কর্মচারীর মাধ্যমে ঘুস সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তা ভাগবাঁটোয়ারা করা হয় বলে জানা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে কোটি কোটি টাকার এই অবৈধ অর্থ প্রবাহ উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কাছেও পৌঁছে যায়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা অভ্যন্তরীণ এই ব্যবস্থার কাঠামো সম্পর্কে তথ্য দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দালালচক্রের মাধ্যমে আবেদন সংগ্রহ করে বিশেষ চ্যানেলে প্রবেশ করানো হয় এবং সেখানে নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। প্রতি আবেদন থেকে সাধারণত এক হাজার পাঁচশত টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।

সূত্র অনুযায়ী, মোট আবেদনের প্রায় আশি শতাংশই দালালচ্যানেলের মাধ্যমে আসে। এসব আবেদনের আলাদা চিহ্নিত ব্যবস্থা থাকে এবং সেগুলোর হিসাব রাখার দায়িত্ব থাকে নির্দিষ্ট একজন কর্মচারীর ওপর, যাকে অভ্যন্তরীণভাবে চ্যানেল মাস্টার বলা হয়। তিনি অর্থ সংগ্রহ ও ভাগবাঁটোয়ারার সমন্বয় করেন।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ঊনসত্তরটি অফিসে আবেদন গ্রহণ করা হয়। এসব অফিসকে দৈনিক আবেদনের সংখ্যার ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—এ, বি এবং সি।

নিচের সারণিতে শ্রেণিবিন্যাস দেখানো হলো:

শ্রেণিদৈনিক আবেদন সংখ্যাবৈশিষ্ট্য
দুই শত থেকে আড়াই শতবেশি চাহিদা ও ঘুস প্রবণ অফিস
বিদুই শতের নিচেমাঝারি আবেদন সংখ্যা
সিএক শতের নিচেতুলনামূলক কম আবেদন

সূত্র জানায়, মোট ৬৯টি অফিসের মধ্যে ৩৩টি এ শ্রেণিভুক্ত, ২৪টি বি শ্রেণিভুক্ত এবং বাকি ১২টি সি শ্রেণিভুক্ত। এ শ্রেণির অফিসগুলোকে ঘুস বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বেশি লাভজনক ধরা হয় এবং এসব স্থানে পোস্টিং পেতে উচ্চ অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

গণনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি সাধারণ অফিসে দৈনিক একশটি আবেদন জমা হলে তার মধ্যে প্রায় আশি শতাংশ দালাল চ্যানেলের মাধ্যমে আসে। প্রতি আবেদন থেকে ন্যূনতম দেড় হাজার টাকা ঘুস ধরা হলে দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা। পাঁচ কর্মদিবসে এটি প্রায় ছয় লাখ টাকা এবং মাসে প্রায় চব্বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে তথ্য সংশোধন, দ্রুত পাসপোর্ট প্রদানসহ বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হয় বলে জানা যায়।

অন্যদিকে বড় আকারের অফিসগুলোতে দৈনিক এক হাজার থেকে দেড় হাজার আবেদন জমা পড়ে। এসব ক্ষেত্রে ঘুসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং কোনো কোনো অফিসে সাপ্তাহিক আয় চল্লিশ লাখ টাকারও বেশি হয়। মাসিক হিসাবে এ অঙ্ক দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে সূত্রের দাবি।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধান কার্যালয়েও প্রতি মাসে নির্ধারিত সময়ে টাকাভর্তি প্যাকেট পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব প্যাকেট গোপনে বিভিন্ন পরিচালক ও উপপরিচালকের টেবিলে বা বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায়ের অফিস থেকে নির্দিষ্ট সময় ও অজুহাতে এসব অর্থ প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং এর একটি অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কিছু পরিচয়ধারী দালালের মধ্যেও বিতরণ করা হয়।

পাসপোর্ট সেবায় মোট অন্তত দশটি খাতে ঘুস আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে আবেদন গ্রহণ, তথ্য সংশোধন এবং দ্রুত সেবা প্রদান উল্লেখযোগ্য। সমস্যা অনুযায়ী ঘুসের পরিমাণও পরিবর্তিত হয়।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অতীতে বিভিন্ন সংস্থা অভিযান পরিচালনা করলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।