খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪১ পিএম

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা আবারও পিছিয়েছে। নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ফলে প্রায় এক দশক আগে করা বহুল আলোচিত এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এ নিয়ে ৯৭ বারের মতো পিছিয়েছে। নতুন করে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত।
রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। তবে সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আদালত নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রুকনুজ্জামান।
Table of Contents
২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাইবার ও আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে সুইফট বার্তার মাধ্যমে একাধিক অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠানো হয়। এসব ভুয়া নির্দেশের মাধ্যমে মোট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেওয়া হয়।
চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ পরে ফিলিপাইনে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তরের পর অর্থের একটি অংশ ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন আর্থিক চ্যানেলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এত বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সুইফট ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনার পর তদন্তকারীদের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—দেশের ভেতর থেকে কেউ কি এই অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ করে দিয়েছিল? কারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার একাধিক স্তর অতিক্রম করে এত বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভেতরের তথ্য ও সহযোগিতা ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে করা ওই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
মামলাটি করার পর তদন্ত সংস্থার দায়িত্ব ছিল অর্থ চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, অর্থ স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং চুরি যাওয়া অর্থের গতিপথ সম্পর্কে আদালতের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা পড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিলিপাইনে পৌঁছানোর পর দেশটির স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করা হয়। পরে অর্থের একটি অংশ তিনটি ক্যাসিনোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।
চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার ফিলিপাইনের একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে ফিলিপাইন সরকার ওই অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দেয়। তবে চুরি যাওয়া বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলারের বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ফলে অর্থের অবশিষ্ট অংশ কোথায় গেছে, কারা এর সুবিধাভোগী এবং কীভাবে অর্থের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ এক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্যদের হাতে গেছে—এসব প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
রিজার্ভ চুরির ঘটনার তিন বছর পর, ২০১৯ সালে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মামলাটি নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালের এপ্রিলে নিউইয়র্কের আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, মামলাটি বিচার করার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতের পর্যাপ্ত এখতিয়ার নেই।
এরপর অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে নিউইয়র্কের এখতিয়ারভুক্ত অন্য আদালতে মামলা করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ উদ্ধারের এই আইনি প্রক্রিয়া এবং দেশের ভেতরে চলমান ফৌজদারি তদন্ত—দুটি ধারাই রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটেছিল ২০১৬ সালে। এরপর প্রায় এক দশক পার হয়ে গেলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল হয়নি। সিআইডি বিভিন্ন সময়ে আদালতের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সময় নিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় প্রতিবারই নতুন তারিখ নির্ধারণ করতে হয়েছে।
রোববারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় আদালত আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। এর ফলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৭ বার পিছিয়ে গেল।
এ দীর্ঘসূত্রতা মামলাটির বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে চুরি যাওয়া অর্থের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল আদালতে উপস্থাপিত না হওয়ায় প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর সিআইডি শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারে কি না, এখন সেটিই মামলাটির পরবর্তী অগ্রগতির অন্যতম প্রধান বিষয়।
মন্তব্য