২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু হতে না হতেই মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টেডিয়ামটি এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা প্রতি বছর প্রায় ১০ ইঞ্চি (২৫ সেন্টিমিটার) পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে। উদ্বোধনী ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত এই স্টেডিয়ামের এমন ভৌগোলিক পরিবর্তন আয়োজক দেশ এবং ফুটবল মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
মূল সমস্যার উৎস: ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল) কৃত্রিম উপগ্রহের শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা ব্যবহার করে এই গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকো সিটির ভূগর্ভস্থ জলাধার (Aquifers) থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে মাটির স্তরে শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। ওপরের বিশাল অবকাঠামোর ভার সইতে না পেরে মাটির স্তরগুলো সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে বসে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মেক্সিকো সিটি মূলত একটি প্রাচীন হ্রদের তলদেশে নির্মিত। নরম কাদা ও পলিমাটির ওপর শহরটি অবস্থিত হওয়ায় এটি আগে থেকেই ভূ-তাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। নাসার বিজ্ঞানী মারিন গভোর্চিন জানান, মাটির নিচের স্তরগুলো থেকে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে মাটির কণাগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো শহরের অবকাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
আজতেকা স্টেডিয়াম ও ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপট
আগামী ১১ জুন মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে এই মাঠে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে। ঐতিহাসিক এই স্টেডিয়ামটি এর আগেও দুটি বিশ্বকাপের (১৯৭০ ও ১৯৮৬) ফাইনাল আয়োজন করেছে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার কিংবদন্তিতুল্য ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটিও এই মাঠেরই সাক্ষী। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এবং নাসার তথ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের কংক্রিটের বিভিন্ন অংশ অসমভাবে মাটিতে বসে যাচ্ছে।
নিচে আজতেকা স্টেডিয়াম ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| স্টেডিয়ামের নাম | এস্তাদিও আজতেকা (Estadio Azteca) |
| অবস্থান | মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো |
| দর্শক ধারণক্ষমতা | ৮৭,৫০০ জন |
| বার্ষিক দেবে যাওয়ার হার | প্রায় ১০ ইঞ্চি (২৫ সেন্টিমিটার) |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা | ৫টি (উদ্বোধনী ম্যাচসহ) |
| মূল কারণ | অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন |
| পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা | নাসা (NASA) |
শহরজুড়ে বিস্তৃত সংকট
নাসার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমস্যাটি কেবল স্টেডিয়ামের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মেক্সিকো সিটির বিশাল এলাকা প্রতি মাসে গড়ে আধা ইঞ্চি করে দেবে যাচ্ছে। গত এক শতাব্দীতে শহরের কিছু অংশ প্রায় ৩০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছে। আজতেকা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল ও ভারী অবকাঠামো এই দেবে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজিত হচ্ছে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। মেক্সিকোর জন্য আজতেকা স্টেডিয়াম একটি আবেগ ও গৌরবের প্রতীক। তবে ফিফা এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের জন্য বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো স্টেডিয়ামের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ বা ভূমি ধস রোধে কোনো বড় ধরনের প্রকৌশলগত পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেনি।
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল ভক্তদের নিরাপত্তা এবং মাঠের স্থায়িত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা তুঙ্গে। নাসার এই বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্বকাপের আনন্দ আয়োজনে কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, মেক্সিকো সরকার এবং ফিফা এই ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় কী ধরনের কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
