ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ক্রমশ জটিল সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান রোববার (১৫ মার্চ) পর্যন্ত টানা ১৬ দিনে গড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উভয় দেশই ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা আক্রমণ জোরদার করেছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে যুদ্ধের এই দীর্ঘায়িত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংকটে পড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ‘ইন্টারসেপ্টর’ বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই ইন্টারসেপ্টরগুলো মূলত শত্রুপক্ষের নিক্ষেপ করা ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত হয়। যুদ্ধের সময় বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে গিয়ে এসব ইন্টারসেপ্টরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সেমাফোর জানিয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর সংকটের বিষয়টি নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা মজুত বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং তাদের ইন্টারসেপ্টরের সরবরাহে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরান শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও সেনা মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর লক্ষ্য হলো একদিকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য আঞ্চলিক হামলা প্রতিরোধ করা।
নিচের টেবিলে ইসরায়েলের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
| প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | প্রধান কাজ | কার্যকারিতা |
|---|---|---|
| আয়রন ডোম | স্বল্পপাল্লার রকেট প্রতিরোধ | গাজা বা নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে নিক্ষিপ্ত রকেট প্রতিহত করে |
| ডেভিডস স্লিং | মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ | ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করে |
| অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩ | দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ | উচ্চ আকাশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম |
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলতে থাকলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। কারণ প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত বেশি এবং দ্রুত পুনরায় মজুত করা সহজ নয়।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা ও কূটনৈতিক তৎপরতাও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
