তেহরানে গণবিবাহে জাতীয় অঙ্গীকারের প্রতীকী আয়োজন

চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজধানী তেহরানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এক ব্যতিক্রমধর্মী গণবিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যা সামাজিক আয়োজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব লাভ করেছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শত শত নবদম্পতি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এই আয়োজনকে ইরান সরকার জাতীয় সংহতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।

সোমবার (১৮ মে) রাতে তেহরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ গণবিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে রাজধানীর কেন্দ্রীয় ও প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ইমাম হোসেন স্কয়ারে শতাধিক যুগলের বিবাহ সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানটি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এবং দেশজুড়ে তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সরকারি সূত্রে জানানো হয়, কর্মসূচিটির নাম রাখা হয়েছে ‘জানফাদা’, যার অর্থ আত্মোৎসর্গ বা প্রয়োজনে নিজের জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার।

সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় চেতনা, দায়িত্ববোধ এবং প্রতিরোধের মানসিকতা জোরদার করা। সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক মন্তব্য এবং ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই আয়োজনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীরা দেশের কৌশলগত স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র অথবা সামরিক অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য বিদেশি হামলার ক্ষেত্রে মানবঢাল হিসেবে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ইরান সরকারের দাবি অনুসারে, ‘জানফাদা’ কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে দেশটির বিপুলসংখ্যক নাগরিক যুক্ত হয়েছেন। সরকারি প্রচারে এতে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অংশগ্রহণের প্রকৃতি, তা সরাসরি নাকি প্রতীকী—এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি প্রচারণায় বিষয়টিকে জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের দৃশ্যায়নেও ছিল ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা। ইমাম হোসেন স্কয়ারে অংশগ্রহণকারী নবদম্পতিরা প্রচলিত বিয়ের গাড়ির পরিবর্তে সামরিক বাহিনীর মেশিনগান সংবলিত জিপে করে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানস্থলে সামরিক সরঞ্জাম, প্রতিরোধের প্রতীকী উপস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে মূল মঞ্চটি বেলুন, আলোকসজ্জা ও উৎসবসজ্জায় সাজানো হয়েছিল। ফলে আয়োজনটিতে একদিকে উৎসবের আবহ, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তার সমন্বয় দেখা যায়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এক নববধূ, যিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন যে, দেশ বর্তমানে সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলেও তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার গঠন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অধিকার অক্ষুণ্ন রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় দায়িত্ববোধ এবং নতুন জীবনের সূচনাকে একসঙ্গে ধারণ করার প্রতীক হিসেবেই তারা এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের প্রতীকী আয়োজন নতুন নয়। অতীতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক উত্তেজনা কিংবা আন্তর্জাতিক চাপের সময়ে দেশটিতে জাতীয় সংহতি জোরদার করতে গণসমাবেশ, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, প্রতিরোধভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি এবং সামাজিক উদ্যোগ আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বার্তা তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিরোধক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে।

বর্তমান আয়োজনকেও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে সরকারের প্রতি জনসমর্থন দৃশ্যমান রাখার প্রয়াস, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কৌশলগত বার্তা। সামাজিক উৎসব, সামরিক প্রতীক এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে তেহরানের এই গণবিবাহ আয়োজন ইরানের বর্তমান রাষ্ট্রীয় বার্তাবিনিময়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।