বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি তীব্র নগদ অর্থের সংকটে পড়ে জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে। গ্রাহকদের আমানত তোলার আকস্মিক ও অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ এবং ব্যাংকের দৈনিক নগদ প্রবাহ সচল রাখার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার (৯ জুন) ব্যাংকটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এই বিশেষ আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদনপত্র জমা দেয়। সম্প্রতি ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংকটির গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে নীতিগত বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও নানামুখী বিতর্কের কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে গত মাত্র এক সপ্তাহে গ্রাহকেরা ব্যাংকটি থেকে একযোগে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ তুলে নিয়েছেন, যা ব্যাংকটিকে এক গভীর আর্থিক ও তারল্য সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের এই বিশাল অঙ্কের জরুরি তহবিল চেয়ে আবেদন করার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে এই প্রসঙ্গে জানান যে, ইসলামী ব্যাংক তাদের উদ্ভূত নগদ টাকার সংকট সামাল দিতে ১০ হাজার কোটি টাকা ধারের একটি আবেদন পেশ করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই আবেদনটি প্রাপ্তির পর তা পর্যালোচনার পর্যায়ে রাখলেও, ব্যাংকটিকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ বা ধার হিসেবে প্রদান করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
ব্যাংকিং খাতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তফসিলি ব্যাংক সাময়িক আর্থিক সংকটে পতিত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভিন্ন নীতিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নগদ অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। তবে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা, যা ব্যাংকের দৈনিক বাধ্যতামূলক নগদ জমা সংরক্ষণের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বজায় রাখতেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ দ্বারস্থ হয়েছে।
নিচে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি, আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া ধারের আবেদনের মূল ফ্যাক্ট বা তথ্যসমূহ একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সংকট ও ধারের আবেদনের বিবরণ
| ক্রমিক সংখ্যা | সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিবরণ | নির্দিষ্ট তথ্যের বিবরণ ও উপাত্ত |
| ১ | ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত ধারের মোট পরিমাণ | ১০ হাজার কোটি টাকা |
| ২ | কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ধারের আবেদন জমা দেওয়ার দিন | মঙ্গলবার, ৯ জুন |
| ৩ | গত এক সপ্তাহে গ্রাহকদের তুলে নেওয়া আমানত | ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি |
| ৪ | সংকটের প্রধান অনুঘটক বা কারণসমূহ | নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ও গ্রাহক ফোরামের আন্দোলন |
| ৫ | আবেদনের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান সিদ্ধান্ত | অর্থ মঞ্জুরের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি |
উদ্ভূত এই পরিস্থিতি নিরসনে এবং ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই আবেদনের প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করছে। সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং ব্যাংকের আর্থিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষও গ্রাহকদের মধ্যকার এই সাময়িক উদ্বেগ ও আতঙ্ক দূর করে ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
