খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুলাই ২০২৬, ৬:১৮ পিএম

“মানুষের মন ও মননের উৎকর্ষ সাধনে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম”—যাঁর দীর্ঘ জীবন এবং সাধনা এই সত্যের এক অনন্য দলিল, তিনি আমাদের জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য, শিক্ষা ও চিন্তাজগতের অন্যতম সেরা আলোকবর্তিকা ছিলেন এই বহুপ্রজ মনীষী। একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং অনুবাদক হিসেবে তিনি বাঙালি মানস গঠনে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা অতুলনীয়।
১৯২০ সালের ২৬ মার্চ মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেন এই কীর্তিমান পুরুষ। তাঁর বাবা সৈয়দ আলী হামেদ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান স্কুল পরিদর্শক এবং মা সৈয়দা কামরুন্নেগার খাতুন ছিলেন ঢাকার নবাবগঞ্জের আগলা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদার ও পীর পরিবারের সন্তান। পারিবারিক এই পরিবেশ তাঁর শৈশব থেকেই পড়াশোনা ও সুসংগত মূল্যবোধের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
ছাত্রজীবনেই সৈয়দ আলী আহসানের প্রজ্ঞা ও বহুমুখী প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান ছিল অপরিসীম। সে সময়ের প্রখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘আজাদ’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ এবং ‘সওগাত’-এ তাঁর কবিতা, গল্প ও চিন্তাগ্রাহী প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি দেশ ও সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশে নিজেকে উজাড় করে দেন। তরুণ বয়সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। দেশভাগের পর বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনর্গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন। ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলা পুঁথিসাহিত্য এবং ঐতিহ্যবাহী মুসলিম লোকসংস্কৃতির সমন্বয়ে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার জন্ম দেন।
১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগারে রূপ দিতে তিনি অসামান্য মেধার পরিচয় দেন। এরপর ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ও কলা অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে দক্ষিণ অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলে এই প্রাজ্ঞ সারথী চুপ করে বসে থাকেননি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান এবং কলকাতার মাটিতে বসে স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে নেমে পড়েন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন লড়াকু শব্দসৈনিক হিসেবে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী এবং রেডিওর তেজস্বী বক্তব্য যুদ্ধাহত বাঙালিকে জুগিয়েছিল অদম্য সাহস।
স্বাধীনতার পর নবগঠিত রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সরকারের আস্থাভাজন হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি একটি আধুনিক সবুজ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার সার্বিক রূপরেখা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের প্রাঞ্জল বাংলা ভাষ্য চূড়ান্তকরণ, জাতীয় সংগীতের নিখুঁত ইংরেজি অনুবাদ এবং শিল্পকলা একাডেমির মূল গঠনতন্ত্র প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। এছাড়া বাংলা একাডেমি ও বাংলা ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে একত্র করে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির দূরদর্শী উদ্যোগটি তারই মস্তিষ্কপ্রসূত।
পরবর্তী জীবনে তিনি ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ১৯৭৭ সালে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব সামলান। ১৯৮৯ সালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষায়াতনিক পদ ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে সম্মানিত করা হয় এবং একই সাথে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার মেলবন্ধনে তাঁর রচিত গবেষণা ও সমালোচনামূলক গ্রন্থগুলো আজও মৌলিক আকর হিসেবে বিবেচিত। ‘পদ্মাবতী’ সম্পাদনা থেকে শুরু করে ‘নজরুল ইসলাম’, ‘রবীন্দ্রনাথ : কাব্যবিচারের ভূমিকা’, ‘মধুসূদন : কাব্য কবি ও কাব্যাদর্শ’ কিংবা ‘বিশ্বসাহিত্য’-এর মতো প্রামাণ্য গ্রন্থগুলো তাঁর গভীর পাঠ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে। ‘ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা’ কিংবা ‘জার্মান সাহিত্য’-এর অনুবাদে তিনি বিশ্বসাহিত্যকে বাংলাভাষীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে একাধিক সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করে। ১৯৬৭ সালে তিনি পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে একুশে পদক এবং ১৯৮৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক/বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’।
২০০২ সালের ২৫ জুলাই এই মহান সারথী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তিনি চলে গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া বিপুল কর্মসম্পদ, মুক্তচিন্তা ও স্বদেশপ্রেম এদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে অনুরাগী মনকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাবে।
মন্তব্য