জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৯:৪৯ পিএম

মাঠের সবুজ ঘাসে গড়ানো একটা ফুটবল কেবল ৯০০ গ্রামের এক চামড়ার গোলক নয়; এর সঙ্গে মিশে থাকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের তীব্র আবেগ, ইতিহাস আর লালিত স্বপ্ন। আর বিশ্ব ফুটবলের সেই বৃহত্তম আসর ‘বিশ্বকাপ’ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব সংকট। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা বনাম ইউরোপের ফুটবলের অভিভাবক উয়েফা—দুই ক্ষমতাধর ফুটবল প্রশাসন এখন সরাসরি সংঘাতের মুখোমুখি। মূল প্রশ্ন একটাই, বিশ্বকাপ কি কোটি মানুষের অনুভূতির জয়গান গেয়ে যাবে, নাকি করপোরেট পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি হয়ে বাণিজ্যিক সম্পদে রূপ নেবে?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক বিতর্কিত ব্যবসায়িক ছক সামনে এনেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে লাভজনক বাণিজ্যিক আয় ত্বরান্বিত করতে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে ২০ মিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরির ঘোষণা দিয়েছে ফিফা।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফিফা তাদের প্রস্তাবিত নতুন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মাইনোরিটি (সংখ্যালঘু) শেয়ার বেসরকারি পুঁজি ও ব্যক্তিগত সংস্থার কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্দেশ্য—আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলারের মূলধন তহবিল সংগ্রহ। এই কাজের জন্য বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক ‘জেপি মরগান’-কে উপযুক্ত বেসরকারি বিনিয়োগকারী অনুসন্ধানের দায়িত্বও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইনফান্তিনোর দাবি, এই বিনিয়োগের প্রতিটি সেন্ট আবার বিশ্ব ফুটবলের অবকাঠামো, নারী ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে, যা ছোট দেশের ফুটবলকে জাগিয়ে তুলবে।
ফিফার উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তাদের অধীনে থাকা ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিটি পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নয়ন অনুদান পাবে। এছাড়া ২০৩৫ থেকে ২০৩৮ পঞ্জিকা বছরের মধ্যে এই অনুদানের অঙ্ক ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ফিফা প্রধানের মতে, এটি হলে ফুটবলে অর্থনৈতিক সমতা আসবে এবং ফুটবল বিশ্বব্যাপী সুষম গতি পাবে।
কিন্তু জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই বাণিজ্যিক ছক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ইউরোপের ফুটবল কর্তাদের সাফ কথা—অর্থের লোভে ফিফা এমন এক বিপজ্জনক লাল দাগ অতিক্রম করছে, যা ফুটবলের মৌলিক স্বকীয়তা, সুশাসন এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে।
উয়েফা তাদের কঠোর অবস্থানে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—‘ফুটবল কোনো কেনাবেচার পণ্য বা বাজারি সম্পদ হতে পারে না।’ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উয়েফা হুংকার দিয়ে বলেছে, কোনো ক্রীড়া সংস্থার এমন বাণিজ্যিক সীমারেখা ভাঙার এখতিয়ার নেই। ফুটবলের মালিক ফিফা একাও নয়, আর ফুটবল বিক্রি করে বাজার গরম করার অধিকারও কাউকে দেওয়া হয়নি। উদ্ভূত সংকট সামলাতে উয়েফাভুক্ত ৫৫টি সদস্য দেশ জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ফিফা যদি বেসরকারি খাতে শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রয়োজনে ‘বিশ্বকাপ বর্জন’-এর মতো নজিরবিহীন ও কঠোর পথ বেছে নিতে পারে। এর আগে ২০২১ সালেও প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের চেষ্টা করেছিল ফিফা, কিন্তু সেবারও উয়েফা বিশ্বকাপ বর্জনের আলটিমেটাম দিলে ফিফা বাধ্য হয়ে নতি স্বীকার করে। ফুটবল বোদ্ধারা মনে করছেন, এবারও সেই একই ঐতিহাসিক হাতিয়ার ব্যবহার করতে যাচ্ছে উয়েফা।
ফিফার এই বাণিজ্যিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে কেবল ফুটবল অঙ্গনই নয়, মুখ খুলেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিকরাও। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এক কড়া বার্তায় ফিফার পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট লেখেন, “বিশ্বকাপ কোনো বাজারে নিলামে তোলার পণ্য নয়। এটি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়া উৎসব। এর কোন অংশ বিক্রি করে দেওয়া মানে আস্ত ফুটবল আত্মাটাকেই বিক্রি করে দেওয়া।”
বরাবরের মতো এবারও স্পষ্ট যে, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে ফিফা বহুকাল ধরেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পকেটে পুরছে। তবে এবার বিশ্বকাপকে কোম্পানির মতো শেয়ার বাজারে রূপ দিয়ে বেসরকারি শেয়ারহোল্ডারদের যুক্ত করার এই প্রচেষ্টা ফুটবলকে সম্পূর্ণ অচেনা গণ্ডিতে দাঁড় করিয়েছে। ফুটবলভক্তদের বড় একটা অংশের শঙ্কা—মুনাফালোভী কর্পোরেট পুঁজি যদি ফুটবলের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তবে কোটি মানুষের পরম ভালোবাসার এই খেলায় আবেগের বদলে কেবলই টাকার অঙ্কের রাজত্ব চলবে।
মন্তব্য