বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁদের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ভাষাসৈনিক গাজীউল হক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গীতিকার, আইনজীবী এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সাহসী সংগঠক। তাঁর পুরো নাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি শুধু একজন সাধারণ কর্মী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেননি, বরং ছিলেন পুরো সংগ্রামের অন্যতম অগ্রসৈনিক। তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠ ও ক্ষুরধার কলমে উচ্চারিত হয়েছিল মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের অমোঘ প্রত্যয়। এই মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের বহুমুখী দিকগুলো বাঙালি জাতির জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে।
Table of Contents
জন্ম, পারিবারিক পরিচিতি ও শিক্ষাজীবন
গাজীউল হক ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন অত্যন্ত সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। তাঁর মাতা নূরজাহান বেগম ছিলেন একজন স্নেহময়ী এবং আদর্শবান নারী। পিতার রাজনৈতিক আদর্শ ও মায়ের নৈতিক শিক্ষার কারণে পারিবারিক পরিবেশ থেকেই গাজীউল হক দেশপ্রেম, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
শৈশবে স্থানীয় একটি মক্তবে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পূর্বে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী আযিযুল হক কলেজে অধ্যয়নকালীন সময়ে তিনি প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা তরুণ গাজীউল হককে রাজনীতি, সমাজচিন্তা ও প্রগতিশীল ভাবধারায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।
ভাষা আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদান
বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুনির্দিষ্ট দাবিতে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে গাজীউল হক তাতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী কর্মী ও সংগঠক ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন ঘোষণা করল যে “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”, তখন প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ছাত্রসভা, ছাত্র ধর্মঘট এবং আন্দোলনের নানাবিধ কর্মসূচিতে গাজীউল হকের সক্রিয় উপস্থিতি ও নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার যখন আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের জনসমাবেশ ও মিছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল, তখন সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী সাহসী ছাত্রনেতাদের মধ্যে গাজীউল হক ছিলেন অন্যতম প্রধান। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর এই নির্ভীক ভূমিকা একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের সেই তীব্র আবেগ ও চেতনাকে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর রচিত গানের মাধ্যমে। তাঁর রচিত অত্যন্ত বিখ্যাত একটি গান হলো:
“ভুলব না, ভুলব না, ভুলব না
এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না”
১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই গানটি প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরির প্রধান সংগীত হিসেবে সমগ্র দেশে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হতো। এই কালজয়ী গানটি ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে ধারণ করে আন্দোলনের মূল চেতনাকে এদেশের আপামর জনগণের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিয়েছিল।
পেশাগত জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সম্মাননা
ভাষাসৈনিক গাজীউল হক পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন সফল ও নামকরা আইনজীবী। ১৯৫৭ সালে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর আইন পেশার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। আইন পেশায় যুক্ত থেকেও তিনি সামাজিক আন্দোলন থেকে দূরে সরেননি এবং ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করার আনুষ্ঠানিক সনদ লাভ করেন। এরপর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে যোগদান করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সম্মানিত আইনজীবী হিসেবে দেশব্যাপী ব্যাপক খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জন করেন।
আইন পেশা এবং সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তিনি সমানভাবে সক্রিয় ও সফল ছিলেন। দেশপ্রেম, সামাজিক সংগ্রাম, ইতিহাসচেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রধান তথ্যাদি সংক্ষেপে নিচের টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
| জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও দিকসমূহ | বিস্তারিত তথ্য, বিবরণ ও ঐতিহাসিক ফ্যাক্টস |
| পূর্ণ নাম | আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক |
| জন্ম তারিখ ও স্থান | ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৯ সাল; নিচিন্তা গ্রাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী |
| পিতা ও মাতার নাম | মওলানা সিরাজুল হক এবং নূরজাহান বেগম |
| উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ভূমিকা | ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ এবং ছাত্রসভার নেতৃত্ব |
| বিখ্যাত সৃষ্টি | “ভুলব না, ভুলব না, ভুলব না / এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না” গানের রচয়িতা |
| পেশাগত অবস্থান | আইনজীবী (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ১৯৭২ সাল থেকে) |
| উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম | জেলের কবিতা, এখানে ও সেখানে একটি কাহিনী, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম |
| অন্যান্য গ্রন্থ | এগিয়ে চলো, মোহাম্মদ সুলতান এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন |
| অর্জিত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা | রাষ্ট্রভাষা পদক, সম্মাননা স্মারক এবং শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কার |
| জীবনাবসান | ১৭ জুন, ২০১৯ সাল |
গাজীউল হকের সাহিত্যকর্মে এদেশের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস ও আইনগত অধিকারের নানাবিধ দিক ফুটে উঠেছে। দেশের প্রতি তাঁর এই অসামান্য ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রভাষা পদক, বিশেষ সম্মাননা স্মারক এবং শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কারসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।
শেষ জীবন ও চিরন্তন স্মরণীয়তা
২০১৯ সালের ১৭ জুন এই মহান ভাষাসৈনিক এবং বীর সংগ্রামী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম, তাঁর রচিত গান, তাঁর আদর্শ এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অগাধ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আজও বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস হয়ে আছে। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন, যৌবন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উৎসর্গ করেছিলেন, গাজীউল হক ছিলেন তাঁদেরই একজন অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সার্থক প্রতিনিধি। যতদিন পৃথিবীতে বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন বাঙালি জাতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর নাম, তাঁর অবদান এবং তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করবে।
