জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৯:৫৭ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে এবার নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিসর। বুধবার দেশটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে সন্দেহভাজন ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই অতর্কিত হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এবার হয়তো নতুন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রটি কেবল নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে এই ঘটনা থেকে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা এবং প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ড্রোন হামলার এই ঘটনাটি ঘটেছে মূলত একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনালে। সেখানে তখন পণ্য খালাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছিল। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যামব্রে’ জানিয়েছে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ‘এনারগোস উইন্টার’ নামের একটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ স্থাপনা। এই জাহাজটি মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী হলেও এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত। ড্রোনটি সরাসরি আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পাশেই নোঙর করে রাখা অন্য একটি জাহাজেও তা আঘাত হানে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কারও হতাহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায়ভারও স্বীকার করেনি।
বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রথমবারের মতো মিসরের কোনো স্থাপনা সরাসরি হামলার শিকার হলো। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে মিসর এই অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ দিন ধরে কায়রো এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল শিবিরের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার নিরন্তর চেষ্টা ছিল তাদের। একদিকে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানোর জোরালো আহ্বানও রেখেছে। শুরু থেকেই কায়রো নিজেদের নিরপেক্ষ রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে, কোনো যুদ্ধরত পক্ষের সঙ্গে সরাসরি জড়ায়নি।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হামলার নেপথ্যে সরাসরি তেহরান অথবা তাদের মদদপুষ্ট আঞ্চলিক সশস্ত্র জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জড়িত থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক এইচ.এ. হেলিয়ার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এই বিষয়ে তার মতামত জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এই ড্রোন হামলার মাধ্যমে মূলত ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্রদের একটি কড়া বার্তা দেওয়া হলো। বার্তাটি হচ্ছে, নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার অনেক বাইরে গিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন স্থাপনায় নিখুঁত আঘাত হানার সামরিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তবে এমন উসকানিমূলক হামলার পরও মিসরের তরফ থেকে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া বা পাল্টা হামলার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হেলিয়ারের মতে, মিসরের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই অত্যন্ত সতর্ক এবং রক্ষণশীল। তারা সাধারণত কোনো আক্রমণাত্মক বা আগ্রাসী সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের সচেতনভাবে বিরত রাখে। নিজেদের সীমানা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের সামরিক বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।
এই ঘটনা মিসর ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ইতিহাস বলছে, ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান এবং মিসরের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরে। টানা কয়েক দশক ধরে এই দুই দেশের মধ্যে চরম শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল। আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে তেহরানের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক দূরত্ব ছিল কায়রোর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই শীতলতার বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছিল। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বেশ আশাব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পায়। ঠিক এমন একটি সম্ভাবনাময় সময়ে মিসরের বন্দরে এই আকস্মিক হামলা দুই দেশের উদীয়মান সম্পর্ক এবং কায়রোর মধ্যস্থতাকারী অবস্থানকে নতুন এক জটিল সমীকরণের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মন্তব্য