মা–বাবার ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা এক ভুয়া তান্ত্রিক চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছে শেরপুর জেলার এক অষ্টম শ্রেণির কিশোরী। এই ঘটনায় প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগে এক তরুণসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে জামালপুরের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২৭ ভরি স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মনির হোসেন (২১)। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীরচর ইউনিয়নের চর যথার্থপুর চান্দাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি একটি প্রতারণা চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পরিচয়ে ভুয়া তান্ত্রিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রতারণার শিকার কিশোরী শেরপুর জেলার একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবং তার বাবা কাপড় ব্যবসায়ী।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীটি পরিবারের মধ্যে নিজেকে কম ভালোবাসা পাচ্ছে বলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই অবস্থায় সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমাধান খুঁজতে গিয়ে টিকটকে তান্ত্রিক পরিচয়ধারী খোরশেদ আলম (২৯) নামের এক ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে। পরে তার সহযোগীরা ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে ইমো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কিশোরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করে এবং সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেয়।
চক্রটি নানা অজুহাতে কবিরাজি ফি, খাসি, জায়নামাজ, আগরবাতি, মোমবাতি, দুধ ও ফল কেনার কথা বলে গত ৬ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিকাশের মাধ্যমে ২ লাখ ৪৩ হাজার ১৫০ টাকা নেয়। পরবর্তীতে আরও টাকা হাতিয়ে নিতে পরিবারের প্রায় সাড়ে ২৭ ভরি স্বর্ণালংকার এবং এক লাখ টাকা গ্রহণ করে তারা।
পরিস্থিতি সন্দেহজনক হয়ে ওঠে যখন কিশোরী আরও টাকা পাঠাতে গেলে দোকানদার তার বয়স ও আচরণ দেখে বিষয়টি সন্দেহ করেন এবং তার বাবাকে জানান। এরপর পুরো প্রতারণা প্রকাশ পায়। পরে কিশোরীর বাবা শেরপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার ভিত্তিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নির্দেশে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের দুই সদস্য মুছা মিয়া (২৯) ও রফিকুল ইসলাম (২৮) কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মূল হোতা মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর তার দেখানো স্থানে বাড়ির পাশের বাগানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা ২৫ ভরি ৯ আনা ৪ রতি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একটি আধুনিক স্মার্টফোনসহ মোট পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬৪ লাখ টাকা বলে জানানো হয়েছে।
অর্থ ও ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপ
| সময়কাল | ঘটনা | স্থান | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| ৬–৯ মার্চ | ধাপে ধাপে অর্থ আদায় | অনলাইন যোগাযোগ | ২,৪৩,১৫০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া |
| পরবর্তী ধাপ | স্বর্ণ ও নগদ টাকা গ্রহণ | ভুক্তভোগীর পরিবার | প্রায় ২৭ ভরি স্বর্ণ ও ১ লাখ টাকা লুট |
| ৯ এপ্রিল | প্রথম অভিযান | গাজীপুরের শ্রীপুর | ২ জন গ্রেপ্তার |
| পরবর্তীতে | মূল হোতা গ্রেপ্তার | ময়মনসিংহ শহর | মনির হোসেন গ্রেপ্তার, স্বর্ণ উদ্ধার |
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন জামালপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত জানিয়েছেন, একাধিক দল সমন্বিতভাবে কাজ করে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ধার করা স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য মালামাল আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হবে এবং গ্রেপ্তারদের আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
