গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির–সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সকাল থেকে ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইটপাটকেল নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামও রয়েছেন। আহত পাঁচ পুলিশ সদস্য ছাড়াও অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছেন গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্যাম্পাস এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই নিয়োগের পরপরই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা শুরু করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা ভিন্ন। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত।
নিয়োগের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় ঢাকা–শিমুলতলী সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। শুক্রবারও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্দোলন অব্যাহত থাকে। নতুন উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় রোববার সকালে ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। সকাল থেকেই আন্দোলনকারীরা প্রধান ফটকে অবস্থান নেন এবং একপর্যায়ে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন।
সকাল ১০টার দিকে নতুন উপাচার্য মোহাম্মদ ইকবাল ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর আগেই প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁকে স্বাগত জানাতে ছাত্রদল–সমর্থিত শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ ফটক খুলে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থী ও বহিরাগত ব্যক্তিদের একটি অংশ বাইরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া এবং প্রধান ফটকের সামনে আগুন জ্বালানোর ঘটনায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে।
সংঘর্ষের সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সংঘর্ষের স্থান | ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর |
| ঘটনার কারণ | নতুন উপাচার্যের যোগদান ঘিরে বিরোধ |
| নতুন উপাচার্য | অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল |
| নিয়োগের উৎস | শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক |
| আহতের সংখ্যা | অন্তত ২০ জন |
| আহত পুলিশ | ৫ জন |
| আহত শিক্ষার্থী | অন্তত ১৫ জন |
| চিকিৎসার স্থান | শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
ঘটনার পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে ছাত্রশিবির–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয় এবং এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল, যুবদল ও বহিরাগত ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপিপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এতে অংশ নেন এবং দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ব্যবহার করা হয়।
উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন উপাচার্য মোহাম্মদ ইকবাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবু তৈয়ব জানান, সংঘর্ষের সময় নতুন উপাচার্য নিরাপদে ছিলেন এবং পরে বিকেলে সাবেক উপাচার্য জয়নাল আবেদীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
