পিতৃত্বের অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলার পর দীর্ঘ ২৭ বছর পর নিজের সন্তানকে আইনগত ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এক প্রবাসী বাবা। চট্টগ্রাম জেলা আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার কার্যালয়ে এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান সম্পন্ন হয়। ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাবা তাঁর সন্তানকে গ্রহণ করতে বাধ্য হন এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও আইনি বিরোধের সফল মীমাংসা ঘটে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার এক প্রবাসী ব্যক্তি তাঁর নিজ প্রতিবেশী এক নারীকে বিবাহ করেছিলেন। বিবাহের কিছু সময় পর এবং তাঁদের সন্তান জন্মগ্রহণের পূর্বেই স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তীব্র পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক প্রদান করে পুনরায় প্রবাসে চলে যান। প্রবাসে থাকাকালীন সময়েই ওই নারীর গর্ভে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। পিতার অনুপস্থিতিতে এবং মাতৃকুলের অভিভাবকত্বে শিশুটি তার নানার বাড়িতে তথা মামার বাড়িতে বড় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ওই প্রবাসী ব্যক্তি বিদেশ থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পন্ন করেন এবং দেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সন্তানটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের পিতার প্রকৃত পরিচয় জানতে পারেন এবং তাঁর মুখোমুখি হয়ে পিতৃত্বের স্বীকৃতির দাবি জানান। কিন্তু ওই প্রবাসী ব্যক্তি তাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি মীমাংসিত না হওয়ায় এবং কোনো অগ্রগতি না দেখে, অবশেষে ২০২৪ সালের জুন মাসে ছেলে নিজের আইনি অধিকার ও পিতার স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা বা সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করেন।
উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অধীনে মা, বাবা ও ছেলের ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনটি সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রের কার্যালয়ে প্রেরণ করে। প্রতিবেদনে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, যুবকের করা পিতৃত্বের দাবি শতভাগ সত্য। এই অকাট্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গতকাল মঙ্গলবার জেলা আইনি সহায়তা কার্যালয়ে বাবা ও ছেলের উপস্থিতিতে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা সম্পাদিত হয়।
সম্পাদিত লিখিত অঙ্গীকারনামা এবং ঘটনার মূল তথ্যের বিবরণ নিচের তালিকায় উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিবরণ ও শর্তাবলী | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সিদ্ধান্ত |
| ১ | আবেদনের সময়কাল | ২০২৪ সালের জুন মাস |
| ২ | বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ধরণ | ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষা |
| ৩ | সম্পত্তির অধিকার | সন্তানকে আইনগতভাবে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রদান |
| ৪ | আর্থিক সহায়তা | বাসস্থান বা ঘর নির্মাণের জন্য নগদ দুই লাখ টাকা প্রদান |
| ৫ | সামাজিক স্বীকৃতি | আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করানো |
| ৬ | উপহার সামগ্রী | মীমাংসায় পৌঁছানোর স্মারক হিসেবে সংস্থার পক্ষ থেকে গোলগলা পোশাক প্রদান |
সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ ও দায়িত্বরত কর্মকর্তা সুব্রত দাশ গণমাধ্যমকে জানান, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রদর্শনের পর বাবা তাঁর সন্তানকে সানন্দে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিরোধের অবসান ঘটিয়েছেন। আইনি বিরোধের এই শান্তিপূর্ণ ও ইতিবাচক মীমাংসায় উভয় পক্ষ এগিয়ে আসায় সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁদের দুজনকে বিশেষ স্মারক গোলগলা পোশাক উপহার দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম জেলা আইনি সহায়তা কর্মকর্তা এরশাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, দীর্ঘ ২৭ বছর পর বাবা ও ছেলের এই মিলন এবং স্বীকৃতি প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে একটি অনন্য ও বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
জন্মের দীর্ঘ ২৭ বছর পর নিজের আইনগত পরিচয় ও পিতার সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে ওই যুবক গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি ব্যক্ত করেন যে, এতদিন ধরে পিতার সুনির্দিষ্ট পরিচয় না থাকায় সমাজে তাঁকে নানা ধরনের কটু ও নেতিবাচক কথা শুনতে হতো। এখন আদালতের নির্দেশনায় ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের মাধ্যমে পিতা তাকে আইনগতভাবে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করায় সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার অর্জিত হলো, যা তাঁর জীবনের অন্যতম এক পরম আনন্দের মুহূর্ত।
