খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৯:৪৭ পিএম

আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মকানুন ও গভর্ন্যান্সের চেনা সমীকরণ ও ভারসাম্য এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে ওলটপালট হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এর ফলে আগামীকাল বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও হাইভোল্টেজ ম্যাচে মাঠে নামতে মার্কিন এই স্ট্রাইকারের আর কোনো বাধা নেই। তবে ফিফার এমন বিতর্কিত ও আকস্মিক পদক্ষেপে ফুটবল বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং বেলজিয়াম ফুটবল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বসনিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের গত ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল বালোগুনকে। টুর্নামেন্টের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের অপরাধের শাস্তি হিসেবে পরের ম্যাচে খেলোয়াড়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকতে হয়। কিন্তু ফিফা তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে এই শাস্তির কার্যকারিতা এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এই ধারায় ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটিকে বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পূর্বে আরোপিত কোনো শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, যা এবার মার্কিন তারকার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলো।
হঠাৎ করে ফিফার এই নিয়ম বদল এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পেছনে খেলার মাঠের বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। নিউইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। খবর অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। সেই ফোনালাপে ট্রাম্প বালোগুনের শাস্তির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান। আর এরপরই ফিফা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের সিদ্ধান্ত বদলে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়।
প্রেসিডেন্টের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং ফিফার নতি স্বীকারের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর উয়েফা আর চুপ করে থাকেনি। অত্যন্ত কড়া ভাষায় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে সংস্থাটি। ফিফার এই সিদ্ধান্তকে ‘দুর্বোধ্য এবং অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে উয়েফা দাবি করেছে, এই কাজের মাধ্যমে ফিফা নিজের ক্ষমতার স্পষ্ট সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং খেলাধুলার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
উয়েফা তাদের বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলে, “অন্য যেকোনো খেলার মতো ফুটবলও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের ওপর ভিত্তি করে চলে। এই নিয়ম ও বিধিগুলোই মাঠে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি। কোনো কোনো নিয়ম হয়তো পরিস্থিতির নিরিখে কিছুটা ব্যাখ্যা বা নমনীয় করার অবকাশ রাখে, তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো এই বিশেষ ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুযোগই ছিল না।” সংস্থাটি আরও মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হওয়ার একমাত্র কারণ হলো এর নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতার ওপর সাধারণ মানুষের অবিচল বিশ্বাস। বিশ্বকাপের মতো আসরে এই ধরনের নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উয়েফা তাদের তীব্র প্রতিবাদ পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ফিফার এই আকস্মিক ও নাটকীয় সিদ্ধান্তে স্বভাবতই স্তম্ভিত বেলজিয়ামের ফুটবল ফেডারেশন (আরবিএফএ)। ম্যাচের ঠিক আগের দিন প্রতিপক্ষের মূল স্ট্রাইকারকে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এক বিবৃতিতে আরবিএফএ জানিয়েছে, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী সব দলের সমান ও ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা জরুরি। ফুটবলের ‘ফেয়ার প্লে’ বা সততার মৌলিক নীতিগুলো সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে তারা এখন সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প পথ খতিয়ে দেখছে।
মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ডাগআউটেও এই বিতর্কের বড় রকমের আঁচ লেগেছে। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া ফিফার এই সিদ্ধান্তকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ ও উপহাস করেছেন। ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে গার্সিয়া সাংবাদিকদের বলেন, “আমি জানতাম না যে ফিফা বিশ্বকাপে ৫ জুলাই তারিখটি হুট করে ১ এপ্রিল হয়ে গেছে এবং আজ এপ্রিল ফুল দিবস।”
দলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়াও ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে আসা এমন সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, শেষ মুহূর্তে এসে এমন ইউ-টার্ন দলের মানসিক এবং কৌশলগত প্রস্তুতিতে এক ধরনের ধাক্কা দেয়। কোর্তোয়া বলেন, “যদি সিদ্ধান্তটি আরও আগে নেওয়া হতো, তবে আমরা মানসিকভাবে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারতাম এবং আমাদের রক্ষণভাগের কৌশলগুলো সেভাবে সাজাতে পারতাম।” ফুটবলীয় রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নেওয়া এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মন্তব্য