খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরে (পিওকে) চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসলামাবাদ প্রশাসনের কঠোর দমন-পীড়ন এবং অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে অঞ্চলটিতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। তীব্র খাদ্য ও ওষুধ সংকটের মধ্যে এবার সরাসরি প্রতিবেশী ভারতের কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা চেয়েছেন আন্দোলনকারীদের প্রধান সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’র (জেএএসি) শীর্ষ নেতা সর্দার আমান খান। একই সাথে দুই কাশ্মীরের মধ্যবর্তী নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলওসি (Line of Control) খুলে দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর সূত্র ধরে এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। রাওয়ালকোটের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল গণসমাবেশে আমান খানকে বলতে শোনা যায়, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধ করতে পুরো অঞ্চলে রেশন ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি ভারতকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান এবং পুঞ্চ ও দোদা সেক্টরে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে চরম সংকটে পড়া মানুষ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় বা সহায়তা নিতে পারে।
রাওয়ালকোটের ওই সমাবেশে লাখো জনতার উদ্দেশে আমান খান প্রশ্ন তোলেন, দাবি আদায়ের জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ রেখার দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত কি না। উপস্থিত জনতাও তখন সমস্বরে “সামনে এগিয়ে চলুন” বলে তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়। ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে এই কাশ্মীরি নেতা বলেন, প্রশাসন যদি জনগণের শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য দাবির জবাব বুলেট দিয়ে দিতে চায়, তবে সাধারণ মানুষও বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে।
শুরুতে বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং আটার দাম কমানোর মতো কিছু মৌলিক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে এই আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। তবে গত মাস থেকে পাকিস্তানি প্রশাসনের বৈষম্যমূলক নীতি ও পুলিশি অ্যাকশনের কারণে ক্ষোভের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই দমনপীড়নের পরই স্থানীয় অর্থনৈতিক আন্দোলনটি রূপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। গত সপ্তাহের এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের “পিওকে পাকিস্তানের অংশ নয়” এবং “আমরা স্বাধীনতা চাই” স্লোগানে মুখরিত হতে দেখা যায়।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাক কাশ্মীরের এই অভ্যন্তরীণ সংকট মূলত ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই ফসল। গত ৫ জুন পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তৃণমূল স্তরের জনপ্রিয় সংগঠন জেএএসি-কে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
থিংক ট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ’-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসলামাবাদ সব সময় তাদের অনুগত পুতুল প্রশাসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি শাসন করে আসছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যে দল থাকে, অলিখিত নিয়মে পাক কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানের আঞ্চলিক নির্বাচনেও সেই দলই জয়ী হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক অধিকার খর্ব করে রাখার এই দীর্ঘদিনের চর্চা এখন সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফলে কাশ্মীরের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক নতুন ও জটিল সমীকরণ তৈরি করতে যাচ্ছে।
মন্তব্য