খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৯:০ পিএম

রাজধানীতে ‘হানিট্র্যাপ’ বা সুকৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এক চাঞ্চল্যকর চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে ভুক্তভোগীকে মারধর, আপত্তিকর ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগে এই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপকমিশনার তরিকুল ইসলাম। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— মো. আনোয়ার হোসেন (৪৫), বদিউজ্জামান শাহীন (৪৫), মরিয়ম (৪৯), শাহাদাত হোসেন (৫৮) ও উর্মী বেগম (৩৯)।
ডিবি পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার এই পাঁচ ব্যক্তি একটি সুসংগঠিত ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে কৌশলে বিত্তবান ও চাকরিজীবী পুরুষদের টার্গেট করে আসছিল। এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। সম্প্রতি দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে গত শুক্র ও শনিবার রাজধানীর সবুজবাগ, বাড্ডা ও খিলগাঁও এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত ৯টি মুঠোফোন, একটি ওয়াকি-টকি এবং নগদ চার হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবির কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একজন ঋণ বিতরণকারী কর্মকর্তা পেশাগত কাজে গত ১৫ এপ্রিল রামপুরার দক্ষিণ বনশ্রীর একটি মার্কেটে যান। সেখানে এক নারী নিজেকে ঋণগ্রহীতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচিত হন এবং কৌশলে তাঁর ভিজিটিং কার্ডটি সংগ্রহ করেন। এর পর থেকে ওই নারী বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মকর্তার সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
একপর্যায়ে গত মে মাসে ওই নারী বনশ্রীর একটি হাসপাতালের সামনে দেখা করার জন্য কর্মকর্তাকে প্রস্তাব দেন। সরল বিশ্বাসে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা সেখানে পৌঁছালে অন্য এক নারী তাঁকে একটি রিকশায় তোলেন। এরপর বিভিন্ন গলি ঘুরিয়ে তাঁকে খিলগাঁও থানা এলাকার একটি নির্জন ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডিবি জানায়, কর্মকর্তা ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই চক্রের বাকি চার পুরুষ সদস্য সেখানে আচমকা হাজির হন। তারা রুমে ঢুকেই ওই কর্মকর্তাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন এবং ভয়ভীতি দেখান। এরপর জোরপূর্বক এক নারীকে তাঁর পাশে বসিয়ে আপত্তিকর অবস্থায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করা হয়। এখানেই শেষ নয়, চক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগীর মুঠোফোন, মানিব্যাগ, পকেটে থাকা নগদ অর্থ, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জোর করে ছিনিয়ে নেয়।
পরবর্তী সময়ে এই ভিডিও ইন্টারনেটে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চক্রটি ভুক্তভোগীর কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করে। মানসম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা তাদের দাবি অনুযায়ী নিজের ব্যাংক হিসাব থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে দফায় দফায় মোট ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। টাকা দেওয়ার পরও চক্রটি তাঁকে ব্ল্যাকমেল করা বন্ধ করেনি। অনবরত হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে গত ২২ জুন খিলগাঁও থানায় একটি মামলা করেন ওই ভুক্তভোগী।
ডিবির কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে এই ভুক্তভোগী ছাড়াও আরও একাধিক ব্যক্তিকে একই কৌশলে ফাঁদে ফেলে চক্রটি বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের মুঠোফোনে এমন অনেক আলামত রয়েছে।” গ্রেপ্তার পাঁচ আসামিকে বর্তমানে পুলিশি রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খিলগাঁও থানার মামলার ঘটনাটিসহ এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ।
মন্তব্য