খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৬:৩ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহার একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ‘শহীদ জননী’ হিসেবে পরিচিত জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি তাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট শেয়ার করেন জায়িদ হাসান জোহা। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “জাহান্নামের ইমামের মরণদিবস আজ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বাস্তবায়ন করেছিল বিদেশি নকশা।”
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা এ মন্তব্যের সমালোচনা করেন। অনেকেই এটিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় আবেগ এবং শহীদ পরিবারের প্রতি অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করেন।
জোহার বক্তব্যের সমালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফী নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, রাকসুর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে অবমাননা করেছেন। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের মন্তব্য ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী এবং একজন নির্বাচিত ছাত্রনেতার কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়।
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আমানউল্লাহ খান আমানও এ ঘটনার সমালোচনা করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আরও জোরালো প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। পাশাপাশি তিনি রাকসুর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে জোহার অপসারণের দাবিও তোলেন।
সমালোচনার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জায়িদ হাসান জোহা বলেন, তার মন্তব্য কোনো শহীদের মাকে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার সূচনা জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে হয়েছিল বলেই তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তার বক্তব্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমি শহীদ হন। পরিবারের এই অসামান্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘শহীদ জননী’ হিসেবে দেশজুড়ে সম্মানিত।
১৯৯২ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবির আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া তার লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
জোহার মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য