বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী এবং প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধিত) অধ্যাদেশ-২০২৫’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারের ফলে একাডেমির বিভাগীয় কাঠামো থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পরিষদে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিভাগীয় পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন
সংশোধিত অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো একাডেমির বিভাগের সংখ্যা ৬টি থেকে বাড়িয়ে ৯টিতে উন্নীত করা। দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ‘চলচ্চিত্র’কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র বিভাগে রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও সমকালীন শিল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ‘আলোকচিত্র’ নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে ‘কালচারাল ব্র্যান্ডিং’ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পচর্চার জন্য ‘নিউ মিডিয়া’কেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিচে পুনর্গঠিত ৯টি বিভাগ এবং পরিচালনা পরিষদের নতুন বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরা হলো:
শিল্পকলা একাডেমির নতুন বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত পরিবর্তন ও নতুন সংযোজন |
| মোট বিভাগ | ৯টি (পূর্বে ছিল ৬টি)। |
| স্বতন্ত্র মর্যাদা | চলচ্চিত্র এবং আলোকচিত্রকে পৃথক বিভাগের মর্যাদা দান। |
| নতুন সংযোজন | কালচারাল ব্র্যান্ডিং, উৎসব ও প্রযোজনা এবং নিউ মিডিয়া। |
| পরিচালনা পরিষদ | ৮টি বিশেষায়িত শিল্প শাখা থেকে ৮ জন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি। |
| বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের সদস্যপদ। |
| প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য | এক প্রশাসনিক বিভাগ থেকে একের অধিক প্রতিনিধি না থাকার নিয়ম। |
| আইনি ভিত্তি | বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধিত) অধ্যাদেশ-২০২৫। |
পরিচালনা পরিষদে বৈচিত্র্য ও স্বচ্ছতা
নতুন অধ্যাদেশে শিল্পকলা একাডেমির নীতিনির্ধারণী পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। আগে যেখানে মাত্র ৩টি শিল্প শাখার প্রতিনিধির সুযোগ ছিল, সেখানে এখন থেকে ৮টি বিশেষায়িত শাখা থেকে ৮ জন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি মনোনীত হবেন। একাডেমির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জাতীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিধান রাখা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ থেকে একাধিক ব্যক্তি প্রতিনিধি হতে পারবেন না।
এর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ থেকে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং জনমত ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদককে পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রকে আলাদা বিভাগের মর্যাদা দেওয়ায় এই মাধ্যমগুলোর জন্য বিশেষায়িত আর্কাইভ তৈরি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎসব আয়োজন সহজতর হবে। কালচারাল ব্র্যান্ডিং বিভাগের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই সংস্কার কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও গতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।
