জাপানে যৌথ অভিভাবকত্ব আইন: পারিবারিক কাঠামোয় ঐতিহাসিক পরিবর্তন

জাপানের পারিবারিক আইন ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশটিতে বিচ্ছেদ পরবর্তী সন্তানের অভিভাবকত্ব বিষয়ে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই আইনের মাধ্যমে জাপানে কয়েক দশক ধরে প্রচলিত ‘একক অভিভাবকত্ব’ ব্যবস্থার অবসান ঘটে ‘যৌথ অভিভাবকত্ব’ পদ্ধতির সূচনা হয়েছে।

পটভূমি ও আইনি সংস্কার

এতদিন পর্যন্ত শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৭ (G7)-এর মধ্যে জাপানই ছিল একমাত্র দেশ, যেখানে বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের ওপর কেবল একজন অভিভাবকের (বাবা অথবা মা) আইনি অধিকার স্বীকৃত ছিল। এর ফলে বিচ্ছেদের পর অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা তাদের অপর অভিভাবকের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। নতুন এই আইনি সংস্কারের ফলে এখন থেকে বিচ্ছেদের পরও বাবা-মা উভয়েই সন্তানের লালন-পালন ও আইনি সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার অধিকার পাবেন।

পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি

জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিচের সারণিতে ২০২৪ সালের প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়পরিসংখ্যান (২০২৪ সাল)
বিচ্ছেদে রূপ নেওয়া বিবাহের হার৩৮.৫%
বিচ্ছেদের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা (১৮ বছরের কম)১,৬৪,০০০ জনের বেশি
পূর্ববর্তী আইনি ব্যবস্থাএকক অভিভাবকত্ব (Sole Custody)
বর্তমান আইনি ব্যবস্থাযৌথ অভিভাবকত্ব (Joint Custody)

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানবিক দিক

এই আইনি পরিবর্তন অনেক বিচ্ছিন্ন অভিভাবকের জীবনে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। হংকং বংশোদ্ভূত জন ডেং, যিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন, এই আইনের একজন ভুক্তভোগী। বিচ্ছেদের পর তাঁর প্রাক্তন সঙ্গী সন্তানদের নিয়ে চলে যাওয়ায় তিনি বর্তমানে তাদের সঙ্গে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে যোগাযোগের সুযোগ পান। এমনকি ফোনে কথা বলা বা সন্তানদের শিক্ষা ও জন্মদিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকারও তাঁর নেই। নতুন আইন কার্যকর হওয়ায় তিনি আশা করছেন, পুনরায় সন্তানদের জীবনে সক্রিয়ভাবে ফিরে আসতে পারবেন।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সমালোচনা

নতুন এই আইন যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গার্হস্থ্য সহিংসতার (Domestic Violence) শিকার হওয়া ব্যক্তি ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

  • নিরাপত্তা ঝুঁকি: সমালোচকদের মতে, যৌথ অভিভাবকত্ব বলবৎ করার ফলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা পুনরায় তাদের নির্যাতনকারী সঙ্গীর সংস্পর্শে আসতে বাধ্য হতে পারেন।

  • বিশেষজ্ঞ মতামত: টোকিওভিত্তিক নারী আশ্রয়কেন্দ্র নেটওয়ার্কের সহপ্রধান চিসাতো কিতানাকা মনে করেন, নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য এই আইন নতুন সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।

  • আদালতের এখতিয়ার: অবশ্য আইনজীবীরা স্পষ্ট করেছেন যে, যদি কোনো ক্ষেত্রে গার্হস্থ্য সহিংসতা বা শিশুর ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আদালত একক অভিভাবকত্বের আদেশ বহাল রাখার ক্ষমতা রাখবে।

উপসংহার

জাপানের এই নতুন আইন মূলত শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় উভয় অভিভাবকের ভূমিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রণীত। একদিকে যেমন এটি শিশুদের উভয় অভিভাবকের স্নেহ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আদালতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে জাপানের বিচার ব্যবস্থার আগামীর মূল পরীক্ষা।