খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ৮:৪০ পিএম

চুয়াডাঙ্গায় এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মর্মান্তিক মামলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে মামলার একমাত্র আসামি আবুল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। ঘটনা ঘটার দীর্ঘ আড়াই বছর পর মামলাটির রায় প্রকাশিত হলো।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোক্তাগীর আলম জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণ ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর। ওই দিন সকালে ভুক্তভোগী শিশুটিকে শাক তুলে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কাছে ডেকে নেন প্রতিবেশী আবুল হোসেন (২৯)। এরপর তাকে নির্জন এক ভুট্টাখেতে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং পরিচয় গোপন রাখতে শিশুটিকে সেখানেই গলা কেটে হত্যা করেন তিনি।
মেয়েটি বাড়ি না ফেরায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে শিশুর মা ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা ভুট্টাখেতের ভেতর শিশুটির রক্তাপ্লুত গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। খবর পেয়ে জীবননগর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এই ঘটনার পরদিন শিশুর বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্তের ধারাবাহিকতায় চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের আবু তাহের মোল্লার ছেলে আবুল হোসেন ওরফে ফটিককে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর জীবননগর থানার সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) সাইফুল ইসলাম আদালতে একমাত্র আসামি হিসেবে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
বিচার চলাকালীন আসামি আবুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বিজ্ঞ আদালত আসামির স্বীকারোক্তির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক প্রমাণাদি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। পরীক্ষায় আসামির ডিএনএ (DNA) প্রোফাইলিং রিপোর্ট পজিটিভ আসে, যা ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে।
পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ৩১ জন সাক্ষীর নিবিড় সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। সাক্ষীদের জবানবন্দি, পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং সিআইডি (CID)-র ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
আদালতের এই রায়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট এমএম শাহজাহান মুকুল। তিনি বলেন, এই নৃশংস ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয়েছে। এটি সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, শিশুদের ওপর যেকোনো সহিংসতার পরিণতি কঠোরতম শাস্তি। অন্যদিকে আসামিপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি খরচে নিযুক্ত স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী ওহিদুজ্জামান মুকুল।
মন্তব্য