জাতিসংঘের যৌন সহিংসতার কালোতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো ইসরায়েল

বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতময় এলাকায় সংঘটিত ভয়াবহ যৌন সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বিশেষ ‘কালোতালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার সুনির্দিষ্ট এবং দূরগামী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বৈশ্বিক এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নিজে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করেছেন।

ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ও তীব্র প্রতিক্রিয়া

গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (যা পূর্বে Twitter নামে পরিচিত ছিল) প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক ভিডিও বার্তায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, ‘বর্তমান এই মহাসচিবের সঙ্গে আমাদের সমস্ত সম্পর্ক এখানেই শেষ।’ আন্তোনিও গুতেরেসের বিশেষ কার্যালয় থেকে অতি দ্রুত প্রকাশিতব্য ওই বার্ষিক প্রতিবেদনের কঠোর সমালোচনা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। সাধারণত সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনটি চূড়ান্তভাবে প্রকাশের পূর্বে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অগ্রিম দেখানো বা অবহিত করা হয়ে থাকে। এর আগে গত বছরের আগস্ট মাসে প্রকাশিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিল যে, ইসরায়েলকেও এই বিশেষ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

can ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন তাঁর বক্তব্যে আরও দাবি করেন, ‘ইসরায়েলকে এই ধরনের একটি কালোতালিকাভুক্ত করা এবং আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতা ব্যবহারের ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা একটি অত্যন্ত জঘন্য সিদ্ধান্ত।’ ড্যানন আরও যোগ করেন যে, জাতিসংঘ মহাসচিব এবং তাঁর অধীনস্থ পুরো দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছে। একই তালিকায় ইসরায়েল এবং হামাসকে সমপর্যায়ে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে জাতিসংঘের প্রতিবেদন, ইসরায়েলের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বিবৃতির মূল তথ্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তুঅভিযুক্ত দেশ ও জাতিসংঘের পদক্ষেপইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানজাতিসংঘের বিশেষ দূতের বক্তব্য
সংঘাতময় এলাকায় যৌন সহিংসতাইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক কালোতালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণজাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার ঘোষণাফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিত যৌন সহিংসতার প্রমাণ রয়েছে
পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা (গত বছরের আগস্ট)মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে কার্যকরজাতিসংঘকে রাজনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হিসেবে আখ্যাএই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল বলে অভিমত

কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও পররাষ্ট্র मंत्रालयের ক্ষোভ

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি মিশন থেকে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে যে, আন্তোনিও গুতেরেস যত দিন পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান বা শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করবেন, তত দিন পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দপ্তরের সঙ্গে ইসরায়েল কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক রাখবে না। প্রকাশিতব্য এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সমভাবে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক পোস্টে বিশ্ব সংস্থাকে একটি ‘রাজনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরাসরি আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তাঁর বিবৃতিতে বলেন, জাতিসংঘ বর্তমান সময়ে তার মূল আদর্শ ও নৈতিক ভিত্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলকে এককভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোই এখন তাদের প্রধান ও একমাত্র কাজে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের অবস্থান ও বিশেষ দূতের পর্যবেক্ষণ

ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এমন চরম ও একতরফা বক্তব্যে ক্ষুব্ধ না হয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রধান মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন যে, ড্যানি ড্যানন কর্তৃক প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি তাঁদের সম্পূর্ণ নজরে এসেছে। তবে তিনি বিশ্ব সংস্থার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে আলোচনা ও কূটনীতির দরজা মহাসচিব সব সময় সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখবেন।’

can অন্যদিকে, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিম আলসালেম এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন যে, অনেক আগেই ইসরায়েলকে এই আন্তর্জাতিক কালোতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে রিম আলসালেম লিখেন, ‘এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি আরও অনেক আগেই আসা উচিত ছিল।’ তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ যৌন সহিংসতার নানাবিধ তথ্য ও উপাদান বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উপায়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অতীতে কেন ইসরায়েলকে এই তালিকায় রাখা হয়নি, তা নিয়ে তিনি স্পষ্ট হতাশা প্রকাশ করেন। সব মিলিয়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।