চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ: স্বপ্নচারণ এক স্রষ্টার স্মরণে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে তারেক মাসুদের নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলোকিত। ১৯৫৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই নির্মাতা শুধুমাত্র ছবি তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি সমাজ, ইতিহাস এবং মানুষের জীবনের নানা দিককে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অনন্য ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। তার কাজ কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং মানুষের জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে। ১৯৮৫ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সোনার বেড়ী’ সমাজ, দেশ ও মানুষের জীবনের প্রতি তার গভীর ভাবনা প্রকাশ করে। একই বছর নির্মিত ‘আদম সুরত’ তথ্যচিত্র তাঁকে প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্রই হবে তাঁর সত্য প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘মুক্তির গান’‘মুক্তির কথা’ কেবল প্রামাণ্যচিত্র নয়, এগুলো যুদ্ধের অতীত, বেদনা এবং উৎসর্গের জীবন্ত দলিল।

তারেক মাসুদের সিনেমায় মানবিক গল্প বলার অনন্য ক্ষমতা ফুটে ওঠে। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যেমন ‘নারীর কথা’, ‘ইন দ্য নেইম অফ সেফটি’, ‘আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’, ‘ভয়েসেস অব চিলড্রেন’—সবগুলোতেই সমাজ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া ‘সে’, ‘নরসুন্দর’, ‘শিশু কথা’, ‘নিরাপত্তার নামে’, ‘বিপন্ন বিস্ময়’, ‘নিরপরাধ ঘুম’, ‘সুব্রত সেনগুপ্ত ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’, ‘ইউনিসন’—প্রতিটি কাজেই তিনি নির্মাণ করেছেন ভিন্ন এক শিল্পভুবন।

২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাটির ময়না’ তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই ছবি বাংলাদেশের সিনেমাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করেছিল। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’-এ প্রদর্শিত হওয়া এবং অস্কারের বিদেশি ভাষার বিভাগে দেশের প্রথম মনোনয়ন—সবই তারেক মাসুদের নির্মাণ দক্ষতার স্বাক্ষর। ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে সমাজের অন্ধকারের মধ্যেও আলো খুঁজে পাওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা স্পষ্ট।

দুর্ভাগ্যবশত, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি জীবন হারান। এই সময় তারেক মাসুদ ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের লোকেশন দেখে ফেরার পথে ছিলেন। একই দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন চলচ্চিত্রকার ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর। তাঁর অবদানকে সম্মান জানিয়ে ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

তারেক মাসুদের সৃষ্টি আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনকে আলোকিত করে চলেছে। গল্প বলার শিল্পে তাঁর দক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজের বাস্তবতার প্রতি গভীর দৃষ্টি এবং মানুষের জীবনকে সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষমতা চিরস্মরণীয়। তিনি নেই, কিন্তু তার চিন্তাধারা, সৃজনশীলতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের নীতি আগামী প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য এক অমর প্রেরণা হয়ে থাকবে।

বিষয়তথ্য
জন্ম৬ ডিসেম্বর ১৯৫৭, নূরপুর, ভাঙ্গা, ফরিদপুর
প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র‘সোনার বেড়ী’ (১৯৮৫)
উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্যচিত্র‘মুক্তির গান’, ‘মুক্তির কথা’
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র‘মাটির ময়না’ (২০০২)
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকান চলচ্চিত্র উৎসব (ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট), অস্কার মনোনয়ন
শেষ চলচ্চিত্র‘রানওয়ে’ (২০১০)
মৃত্যু১৩ আগস্ট ২০১১, মানিকগঞ্জ
রাষ্ট্রীয় সম্মাননাএকুশে পদক (২০১২, মরণোত্তর)

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রপথ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রেরণা হিসেবে অমর থেকে গেছে।