জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুলাই ২০২৬, ৪:১ পিএম

অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে চোটের কারণে বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ক্রিকেটার বর্তমানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় দল নির্বাচনের পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে তরুণ পেসার নাহিদ রানাকে ঘিরে। চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজে তাকে পাওয়া যাবে না বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মেডিকেল বিভাগ।
জিম্বাবুয়ে সফরের সময় বাম পাশের পেশিতে চোট পেয়েছিলেন নাহিদ রানা। পরবর্তী পরীক্ষায় তার ‘গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন’ ধরা পড়ে। মেডিকেল বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, চোট থেকে সেরে উঠতে তার প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে সরাসরি ফেরার সুযোগ নেই। ধাপে ধাপে বোলিংয়ের চাপ ও ওয়ার্কলোড বাড়িয়ে শরীরকে ম্যাচের জন্য প্রস্তুত করতে আরও দুই থেকে চার সপ্তাহ প্রয়োজন হতে পারে। সব মিলিয়ে মাঠে ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পুরো টেস্ট সিরিজেই তাকে বাইরে থাকতে হবে।
নাহিদের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের পেস আক্রমণের জন্য বড় ধাক্কা। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের বোলিং ইউনিটে নিজের জায়গা শক্ত করার পাশাপাশি তার গতি ও আক্রমণাত্মক বোলিং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে একজন গতিময় পেসারের কার্যকারিতা আরও বেশি হতে পারে। ফলে তাকে না পাওয়ায় বাংলাদেশের বোলিং পরিকল্পনায় বিকল্প সমন্বয় করতে হবে।
তবে নাহিদের পাশাপাশি আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের ফিটনেস পরিস্থিতিও বাংলাদেশের দল গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। বাঁ-হাতি পেসার শরিফুল ইসলাম বর্তমানে গ্রেড-১ বাম হ্যামস্ট্রিং চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তার পুনর্বাসন আপাতত সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৯ জুলাই থেকে তার বোলিং শুরু করার কথা। এরপর ১২ আগস্ট তার ফিটনেস পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুনর্বাসনের ধাপগুলো সফলভাবে শেষ করতে পারলে এবং বোলিংয়ের ওয়ার্কলোড সামলাতে সক্ষম হলে দ্বিতীয় টেস্টে তাকে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে প্রথম টেস্টে তার খেলার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশের ব্যাটিং ও উইকেটকিপিং বিভাগেও রয়েছে উদ্বেগ। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন কুমার দাস বাম পায়ের কাফ মাসলের চোট থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তিনি সিঙ্গাপুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন এবং প্লেটলেট-রিচ প্লাজমা থেরাপি নিয়েছেন। পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৮ জুলাই থেকে তার ধাপে ধাপে রানিং ও ফিটনেস কন্ডিশনিং শুরু করার কথা রয়েছে। ১৩ আগস্ট তার ফিটনেস পরীক্ষা হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে দ্বিতীয় টেস্ট থেকে লিটনকে নির্বাচকদের বিবেচনায় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডানহাতি পেসার তানজিম হাসান সাকিবের পরিস্থিতি অবশ্য আরও জটিল। তিনি এখনো পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছেন। সাম্প্রতিক স্ক্যান ও বিদেশি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, তাকে আরও কিছু সময় পুনর্বাসনে থাকতে হবে। প্রায় আট থেকে দশ সপ্তাহ পর তার পুনরায় স্ক্যান করার কথা রয়েছে। হাড়ের ক্ষত কত দ্রুত সেরে ওঠে, তার ওপরই নির্ভর করবে তার মাঠে ফেরার সময়। বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের শেষ দিকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিজ্ঞ বাঁ-হাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানও চোট কাটিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিং ও কাফ মাসলের চোটের কারণে তিনি নিয়মিত পুনর্বাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। চলতি মাসের শেষ দিকে তার ফিটনেস মূল্যায়ন হওয়ার কথা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিংয়ের ওয়ার্কলোড বাড়ানোর ধাপ শুরু হবে। সবকিছু সন্তোষজনকভাবে এগোলে ১৮ আগস্টের পর জাতীয় দলের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তার।
চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদের বর্তমান পরিস্থিতি সংক্ষেপে এমন—
| ক্রিকেটার | চোট বা সমস্যা | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ | অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সম্ভাবনা |
|---|---|---|---|---|
| নাহিদ রানা | গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন | পুনর্বাসনে | ছয় থেকে আট সপ্তাহের পুনরুদ্ধার | পুরো সিরিজে বাইরে |
| শরিফুল ইসলাম | গ্রেড-১ বাম হ্যামস্ট্রিং | পুনর্বাসন সন্তোষজনক | ২৯ জুলাই থেকে বোলিং | দ্বিতীয় টেস্টে সম্ভাবনা |
| শরিফুল ইসলাম | হ্যামস্ট্রিং পুনর্বাসন | ফিটনেস পর্যবেক্ষণে | ১২ আগস্ট ফিটনেস পরীক্ষা | প্রথম টেস্টে অনিশ্চিত |
| লিটন কুমার দাস | বাম কাফ মাসলের চোট | ধীরে ধীরে সুস্থ | ২৮ জুলাই থেকে রানিং ও কন্ডিশনিং | দ্বিতীয় টেস্টে সম্ভাবনা |
| লিটন কুমার দাস | কাফ মাসল পুনর্বাসন | বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চিকিৎসা | ১৩ আগস্ট ফিটনেস পরীক্ষা | ফিটনেসের ওপর নির্ভরশীল |
| তানজিম হাসান সাকিব | হাড়ের ক্ষত | পুনর্বাসনে | আট থেকে দশ সপ্তাহ পর স্ক্যান | ফেরার সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদি |
| তানজিম হাসান সাকিব | চলমান পুনর্বাসন | বিশেষজ্ঞের পরামর্শে | পরবর্তী স্ক্যানের পর মূল্যায়ন | অস্ট্রেলিয়া সিরিজে অনিশ্চিত |
| মুস্তাফিজুর রহমান | ডান হ্যামস্ট্রিং ও কাফ মাসল | পুনর্বাসনে | ফিটনেস মূল্যায়ন ও বোলিং ওয়ার্কলোড | আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে সম্ভাবনা |
| নাহিদ রানা | বাম পাশের পেশির চোট | প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের বাইরে | ধাপে ধাপে বোলিংয়ে ফেরা | সিরিজে নেই |
| মুস্তাফিজুর রহমান | পায়ের পেশির চোট | নিয়মিত পুনর্বাসন | ওয়ার্কলোড সফলভাবে সম্পন্ন করা | নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির সম্ভাবনা |
বর্তমান পরিস্থিতিতে নাহিদ রানাকে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। শরিফুল ইসলাম ও লিটন কুমার দাসের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় টেস্টকে লক্ষ্য ধরে এগোনোর সুযোগ থাকলেও তাদের ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে পুনর্বাসন, ফিটনেস পরীক্ষা এবং ক্রিকেটীয় কার্যক্রমে ফেরার ওপর। তানজিম হাসান সাকিবের ক্ষেত্রে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে মুস্তাফিজুর রহমানকে আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত পাওয়ার আশাবাদ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের আগে এই চোটের তালিকা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে পেস আক্রমণে নাহিদের অনুপস্থিতি দলের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শরিফুল ও মুস্তাফিজের ফিটনেস পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লিটন কুমার দাসকে না পাওয়া গেলে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্বেও নতুন সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল কাজ। একদিকে চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদের নিরাপদ ও কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সম্ভাব্য বিকল্পদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত রাখা। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্যের জন্য শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা নয়, পুরো দলের ভারসাম্য এবং একাধিক বিকল্প পরিকল্পনাও জরুরি। সিরিজ শুরুর আগে তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হবে চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা; আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, যারা ফিরতে পারবেন না তাদের ঘাটতি পূরণ করে একটি কার্যকর দল গড়ে তোলা।
মন্তব্য